ছিল Song, হইলো সঙ!

সংগীতের চলতি ট্রেন্ড, রিমেক এবং কভার। ধরুন শৈশব কিংবা আলতো কৈশোরের আপনার প্রিয়তম গানগুলোকে যদি স্রেফ ইউটিউবের হিট বাড়াতে কিংবা কাহিনিবিহীন একটি সিনেমা দেখতে দর্শকদের হলে টানতে ব্যবহৃত হয় তাহলে আপনার কেমন লাগবে? এই বছরে অতীব অমায়িকভাবে ভারতীয় মূলধারার প্রায় প্রতিটি হিন্দি সিনেমাতেই ঘটে গেছে এমন প্রায় অসম্ভব ঘটনা। হিন্দি গান কেন শুনি বা শুনব- সেই তর্কে না যেয়েও বলা যায় যে আকাশ সংস্কৃতির দুয়ার খোলা রেখেতো আর হিন্দি গানের হলুদের আসর দখল করা ঠেকানো যাবে না! ইউটিউবের বদান্যতায় মাহতিম শাকিব কিংবা সনম পুরিরা কভার করে যে গান ছাড়ছেন তা নাহয় মেনেই নিলেন। কিন্তু মূলধারার সিনেমাতেই রিমেকের নামে যেভাবে যা চলছে তাতে গানের সিন টেনে দেওয়া বাদে টরেন্ট নির্ভর ক্যাটরিনা-দীপিকার ভক্তদের আর কিছু করার আশু সুযোগ দেখা যাচ্ছে না। তো চলুন না, এক ঝলকে দেখে নিই এবছরের রিমিক্স/রিমেক/ট্রিবিউট লিস্ট।

পেহলা নেশা

বছরের শুরুতেই ভারতের জাতীয় পুরস্কার জয়ী ওনিরের নতুন সিনেমা মুক্তি পেয়েছিল। নাম ‘কুচ ভিগি আলফাজ’। সিনেমায় ছিল তিনটি গান, সবকটিই রিমেক। অংশুমানের সংগীত পরিচালনায় পেহলা নেশা গানটিও নতুন করে গেয়ে দেন জুবিন ও পলক মুছল। তাতে ২৬ বছর বয়সী গানটির কি হাল হয়েছে সেটাই দেখুন।

১৯৯২ সালের বিখ্যাত গান ‘পেহলা নেশা’।  সিনেমার নাম ‘জো জিতা ওহি সিকান্দার’। স্লো-মোশনে চিত্রায়িত গানটির সঙ্গীত আয়োজনে ছিলেন দু’ভাই যতীন-ললিত। গানটি গেয়েছিলেন সাধনা সারগম ও উদিত নারায়ণ। কিশোরবেলার প্রেমের সেই গানে আমির খান, পূজা বেদি ও আয়েশা জুলখাকে আজও ভোলেনি দর্শক।

আশিক বানায়া আপনে

‘হেট স্টোরি-৪’ সিনেমায় রিমেক হয় ‘আশিক বানায়া আপনে’ গানটি। ঠিক ১৩ বছর আগের এই আলোচিত গানটি নাকি সুরে আবারও গেয়েছেন সেই হিমেশ রেশমিয়া, তবে সাথে এবার আর শ্রেয়া ঘোষাল নন, ছিলেন নেহা কাক্কার।

২০০৫ সালের সবচে আলোচিত সিনেমা ছিল ‘আশিক বানায়া আপনে’। গানটির চিত্রায়নে ছিলেন কিসিং মেশিন ইমরান হাশমি, সাথে মিস ইন্ডিয়া তনুশ্রী দত্ত। সিনেমাও ছিল সিজলিং হট, সুতরাং হিটও। তারই সাথে হিট হয়েছিলেন হিমেশ। এরপর লাগাতার বছরখানেক হিট দিয়েছেন হিমেশ।

লাগ যা গালে

যার জীবন নিয়ে সিনেমা বানালে সেটা হয় বছরের সেরা হিট সেই আলোচিত-সমালোচিত তারকা সঞ্জয় দত্ত এলেন জাতীয় পুরস্কারজয়ী তিগমাংশু ধুলিয়ার সিনেমা করতে। ‘সাহেব বিবি ঔর গাংস্টার-৩’ সিনেমায় তাই হয়তো রিমেক হলো লাগ যা গালে গানটি। গানটি গাওয়ার দায় নিয়েছেন জোনিতা গান্ধী।

‘ওহ কউন থি’ সিনেমায় প্রখ্যাত সুরকার মদনমোহনের সংগীত পরিচালনায় লতা মুঙ্গেশকর কন্ঠ দিয়েছিলেন ‘লাগ যা গালে’ গানটিতে। জুবিলিকুমার বলে খ্যাত মনোজকুমার ও সাধনার অভিনীত গানটির দৃশ্যায়নও ছিল মন ছুঁয়ে দেওয়া।  ১৯৬৪ সালের সেই বিখ্যাত গানটি যে কারোর পছন্দের সেরা ১০টি হিন্দি গানের লিস্টিতে জায়গা করে নেওয়ার মতো অনিন্দ্য সুন্দর।

বাদানপে সিতারে 

অনিল কাপুর, ঐশ্বরিয়া রাই বচ্চন এবং হালের ক্রেজ রাজকুমার রাওয়ের সিনেমা ‘ফান্নে খান’ বক্স অফিসে ডুবেছে দ্রুততম গতিতে। সেই সাথে ডুবেছে একটি অমর হিন্দি গানও, বাদানপে সিতারে। রিমেক করেছিলেন অমিত ত্রিবেদী, কণ্ঠ সনু নিগামের।

মোহাম্মদ রফির কন্ঠে গাওয়া অরিজিনাল গানটিতে ঠোঁট মিলিয়ে ছিলেন শাম্মী কাপুর ও  বৈজয়ন্তী মালা।  সিনেমার নাম ছিল ‘প্রিন্স’। সঙ্গীত আয়োজন শংকর-জয়কিষেনের।

দিলবার

এবছরের প্রধানতম আলোচিত-সমালোচিত রিমেকটির নাম দিলবার। জন আব্রাহামের অভিনীত-প্রযোজিত ‘সত্যমেব জয়তে’-এর আইটেম সংয়ে নেচেছেন নোরা ফাতেহি। এই ক্ল্যাসিক গানটির ধ্বংসের দায়ও নিয়েছেন নেহা কাক্কার।

১৯৯৯ সালের মুক্তি পায় বাংলা সিনেমা ‘হঠাৎ বৃষ্টি’র হিন্দি রিমেক ‘সির্ফ তুম’। নায়ক সঞ্জয় কাপুর, নায়িকা প্রিয়া গিলকে ছাপিয়ে আলো ছড়ান সুস্মিতা সেন। সিনেমার তুলনায় আলোচনায় আসে গান, ‘দিলবার দিলবার’।

মেরা নাম চিন চিন চু

অভিনয় যেমন করুন না কেন- গান তিনি গাইতেই পারেন। সোনাক্ষী সিনহার দাবি সম্ভবত এমনই। নাহলে অভিনয়ের পাশাপাশি ‘হ্যাপী ফের ভাগ যায়েগি’ সিনেমার ‘মেরা নাম চিন চিন চু’ গানটি গাওয়ার দুঃসাহস তার দেখানোর কথা না!

সেই ১৯৫৮ সালের সিনেমা, নাম ‘হাওড়া ব্রিজ’। নায়িকা সুন্দরীতমা মধুবালা কিংবা নায়ক অশোক কুমারকে ছাপিয়ে শুধু এই গানে নিজের পারফরমেন্সের কারণে আজও বাচ্চা-বুড়ো সকলের প্রিয় হয়ে আছেন হেলেন।

রাফতা রাফতা

রেস-৩ নামের অখাদ্য সিনেমার পরিচালক রেমো ডি’সুজার কোরিওগ্রাফিতে ‘রাফতা রাফতা’ গানটি রিলিজই পেয়েছে মাত্র গেল ২৪ আগস্ট। তারকাবহুল সিনেমা ইয়ামলা পাগলা দিওয়ানা’র তৃতীয় কিস্তিতে এই আইটেম সংয়ে দেওল ফ্যামিলির পারিবারিক এই সিনেমায় উপস্থিত তারকারা ছাড়াও ক্যামিও করেছেন অনেকেই। র‌্যাপ করেছেন স্বয়ং রেখা, ছিলেন শত্রুঘ্ণ সিনহা। আর আছেন সালমান খান, সোনাক্ষী সিনহাও।

‘রাফতা রাফতা’ গানটির অরিজিনিয়াল ভার্সনে ছিলেন ধর্মেন্দ্র, রেখাও। গেয়েছিলেন কিশোর কুমার ও লতা মুঙ্গেশকর।  সিনেমার নাম ‘কাহানি কিসমত কি’।

জিংগাত

শ্রীদেবী কন্যার প্রথম সিনেমার বলে কথা! যদিও এতসব আলোচনার পরে মূল সাইরাটের ধারে কাছেও পৌধাতে পারেনি ধাড়াক। অবশ্য আরও আলোচনা হয়েছে কোন জিংগাত গানটি সেরা- তাই নিয়ে। করন জোহরের প্রযোজনা যে প্রায়ই কিছু অসাধারণ সিনেমাকে ধ্বঙস করে দেয় তারই উদাহরণ হয়ে থাকবে ধাড়াক এবং অতি অবশ্যই জিংগাতও।

মাত্র বছর দুয়েক আগের মুক্তি পাওয়া মারাঠি সিনেমা ‘সাইরাট’। অজয়-অতুলের সংগীত আয়োজন, গানের কথা কিংবা সুর সব মিলিয়ে সেবারে সেরা মিউজিক অ্যালবামের পুরস্কার জিতেছিল মারাঠি ফিল্মফেয়ারের আসরে এই সিনেমাটি। ব্যবসাসফল এবং একই সাথে দর্শককে ভাবতে বাধ্য করা সিনেমাটির জিংগাত গানটিও জনপ্রিয়তা পেয়েছিল।

হাই রেটেড গাবরু

পিওর আইটেম সং। মানে সিনেমায় বরুণ ধাওয়ান কিংবা শ্রদ্ধা কাপুরের নাম নিশানা নেই। কিন্তু ‘নওয়াবজাদে’ সিনেমায় ইন্ডি পপ হিসেবে রেডিমেড হিট গুরু রানধাওয়ার ‘হাই রেটেড গাবরু’ গানটি ব্যবহৃত হয়েছে। সিনেমার এহেন বিজ্ঞাপনে অবশ্য মশলা যোগ করে কাজ খুব একটা হয়নি।

গুরু রানধাওয়ার গানটি গেয়েছিলেন ২০১৭ সালেই। ইউটিউবের কল্যানে দারুণ জনপ্রিয় গানটির মিউজিক ভিডিওর দৃশ্যায়ণ হয়েছিল আমেরিকান বিভিন্ন আকর্ষনীয় স্পটে।

রেস টাইটেল ট্রাক 

সাইফ আলি খান নেই, এসেছেন সালমান খান। পরিচালকের সাথে সাথে রেস সিনেমার তৃতীয় কিস্তির টাইটেল ট্রাকও বদলে গেছে এবারে, দেখে নিন এক ঝলক।

‘রেস’ ফ্রাঞ্চাইজির প্রথম সিনেমা রিলিজ হয়েছে এক দশক আগে। প্রতিটি সিনেমায় বেঁচে-মরে মূল চরিত্রের প্রায় সকলকেই বাদ দিয়ে বদলে গেছে রেস ৩-ও। প্রতি কিস্তিতে বদলে গেছে রেসের টাইটেল ট্রাকের আমেজ।  নিরাজ শ্রীধর ও সুনিধি চৌহানের সেই রেস গানটি ছাড়াও সিনেমার অন্যান্য গানগুলোও বেশ আলোচিত হয়েছিল সেই সময়ে। সংগীত আয়োজনে ছিলেন প্রীতম।

এক দো তিন

ধরুন একটা সুন্দর গানকে আপনি কত সহজে স্রেফ নষ্ট করে দিতে পারেন তার উদাহরণ হতে পারে এক দো তিন। ‘বাগি-২’ সিনেমায় শ্রেয়া ঘোষাল এবং জ্যাকুলিন ফার্নান্দেজ স্রেফ নষ্ট করে দিয়েছেন নব্বইয়ের দশকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ডান্সিং নাম্বারটিকে।

‘তেজাব’, ১৯৮৮ সালের সেই সিনেমা। আজকের বিচারে একদমই ভালো ছিলোনা মাধুরীর কস্টিউম। কিন্তু নাচে মাধুর্য ছিল, অভিব্যক্তি ছিল, সারল্য ছিল। কণ্ঠ দিয়েছিলেন অলকা ইয়াগনিক।

এবং মুক্কাবেলা

‌’চিলড্রেন অব হেভেন’ আর ‘দ্য কালার অব প্যারাডাইস’-খ্যাত ইরানি পরিচালক মাজিদ মাজিদি এবছরে ভারতে বানিয়েছেন একটি সিনেমা, ‘বিয়ন্ড দ্য ক্লাউডস’। যাতে প্রায় দুই যুগ পর আবারও দর্শক শুনেছে  মুক্কাবেলা মুক্কাবেলা গানটি। দ্বিতীয়বারের মতো বিখ্যাত তামিল সেই গানটির সংগীত আয়োজন করেছেন এ আর রহমানই। এবং সেকারণেই শহীদ কাপুরের ছোট ভাই ইশান খাট্টারের শ্যাডো ড্যান্সিংয়ের পাশাপাশি গানটিও দারুন লেগেছে সবারই।

তামিল, ‘কালাধান’-এ প্রথম ব্যবহৃত হয়েছিল এই গানটি। প্রভু দেবা আর নাগমার নাচে পুরো ভারত হয়ে গিয়েছিল মুগ্ধ। সারা দেশে এতটাই সারা জাগিয়েছিল গানটি যে সেসময় ডাব করে কালাধানের হিন্দি সংস্করণও রিলিজ করেছিল প্রযোজকরা।

তো পাঠক, আপনারই বলুন Song, সঙ হলে কেমন লাগে? একটু খারাপই লাগে, না?

mm
Zannatun Nahar

Zannatun Nahar Nijhum, an aspiring writer and traveler who loves to learn from the nature.