বাংলাদেশের নাট্য মঞ্চে তারুণ্যের নব আহ্বান জানিয়ে “নাট্যমঞ্চ হোক আনন্দ-উৎস”- স্লোগানে গত ৪ সেপ্টেম্বর শুরু হয়েছিলো ‘আইডিএলসি নাট্য উৎসব ২০১৮’। আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইডিএলসি ফাইন্যান্স লিমিটেডের আয়োজনে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালায় অনুষ্ঠিত হয় এই নাট্যোৎসবের। যার সমাপ্তি ঘটে নাট্যজন সম্মাননার মধ্য দিয়ে, ৮ সেপ্টেম্বর। নাট্যোৎসবের উদ্বোধন করেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী ও বিশিষ্ট নাট্য ব্যক্তিত্ব আসাদুজ্জামান নূর এম.পি।

উৎসবের পোস্টার

৮ সেপ্টেম্বর প্রধান অতিথি  হিসেবে সমাপনীতে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান। দেশীয় সংস্কৃতির বিকাশে দেশের মঞ্চে প্রাণসঞ্চারে শক্তিমান ভূমিকা রাখায় আইডিএলসি’র উদ্যোগে এ উৎসবে চার দম্পতিকে নাট্যজন সম্মাননা পদকও প্রদান করেন প্রধান অতিথি অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান। নাট্যজন সম্মাননায় ভূষিত এ চার দম্পতি হলেন- সারা যাকের ও আলী যাকের, ফেরদৌসী মজুমদার ও রামেন্দু মজুমদার, লাকী ইনাম ও ড. ইনামুল হক এবং শিমূল ইউসুফ ও নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু।

প্রধান অতিথি হিসেবে নিজের বক্তব্যে ড. আনিসুজ্জামান বলেন “থিয়েটার সময়ের কথা বলে, বলে সমাজের ও মানুষের কথা আর এই থিয়েটারই পারে মঞ্চের সাথে দর্শকদের সম্পর্ক স্থাপন করতে।”

মঞ্চে অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান

আইডিএলসি নাট্য উৎসবের ৫ দিনে মোট ১০টি নাটক প্রদর্শিত হয়। বিশাল এই নাট্যোৎসবে যেমন গ্রুপ থিয়েটারভিত্তিক নাট্যদলগুলো অংশগ্রহণ করে, তেমনি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যচর্চাকেন্দ্রিক বিভাগগুলিও অংশ নেয়। উৎসবের শুরুটা হয় ‘প্রাঙ্গণে মোর’ প্রযোজিত নাটক ‘হাছনজানের রাজা’- এর মাধ্যমে, উৎসবের পর্দা নামে ‘থিয়েটার’ প্রযোজিত নাটক ‘ওপেন কাপল’ দিয়ে। আসুন এক ঝলকে দেখে নেওয়া যাক আইডিএলসি নাট্যোৎসবের ১০ নাটক সম্পর্কে-

হাছনজানের রাজা
বর্ণিল জমিদারী জীবন ছেড়ে হাছন রাজা হাজির হন ভাটি অঞ্চলে, খুঁজে বেড়ান নিজেকে আর সৃষ্টিকর্তাকে। এই তালাশের মধ্য দিয়েই হয় ‘হাছনজানের রাজা’র আত্ম-উপলব্ধি। নাট্যকার শাকুর মাজিদ ‘হাছন রাজা’র জীবনকে মঞ্চের উপযোগী করেছেন এই তালাশের মধ্য দিয়েই। নির্দেশনা দিয়েছেন অনন্ত হীরা। ‘প্রাঙ্গণে মোর’ প্রযোজিত নাটকটি আইডিএলসি নাট্যোৎসবে প্রদর্শিত হয় ৪ সেপ্টেম্বর, সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায়।

দ্য লোয়ার ডেপথস
রুশ সাম্যবাদী ম্যাক্সিম গোর্কির কালজয়ী নাটক ‘দ্য লোয়ার ডেপথস’। নিরাশার অন্ধকারে ডুবে থাকা সমাজের নীচুতলার কিছু মানুষ জরা-মৃত্যু’র মাঝেও দেখে স্বপ্ন। স্রোতের বিপরীতে ক্ষীণ আশা নিয়ে লড়ুয়ে জীবনগুলো এক এক করে হারিয়ে যায়, নিয়তির পরিহাসে। সমাজের নীচুতলার মানুষদের এই প্রতি ক্ষণে বেঁচে থাকার লড়াইয়ের জয়গানকেই উপজীব্য করে এগিয়ে গেছে লোয়ার ডেপথস। ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের থিয়েটার এন্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগ’- এর প্রযোজিত নাটকটির নির্দেশনা দিয়েছেন বিভাগীয় শিক্ষক তানভীর নাহিদ খান। অভিনয় করেছেন বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থীরা। এই নাটকটিও প্রদর্শিত হয়েছে উৎসবের প্রথম দিন, রাত সাড়ে ৮টায়।

উৎসবের নাটকীয় সব মুহূর্তরা

ট্রায়াল অব সূর্যসেন
ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের সংগ্রামী সূর্যসেনের বিচারকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে নাটকটির বিষয়বস্তু। ইতিহাসের পরিপ্রেক্ষিতে মাস্টারদাকে দর্শক-ই বিচার করবেন, মাপবেন নিজ নিজ বিবেকের নিক্তিতে। ‘ট্রায়াল অব সূর্যসেন’ নাটকটি প্রযোজনা করেছে ‘ঢাকা পদাতিক’।

বাংলার মাটি বাংলার জল
জমিদারির দেখভাল করতে গিয়ে এ বাংলার মানুষ-মাটি-প্রকৃতি-সুরের প্রেমে পড়লেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। যে ভালোবাসার হদিস মেলে তাঁর লেখা ‘আমার সোনার বাংলা’র সুরে। রবি ঠাকুর আর বাংলার এই পারস্পারিক প্রেমকে উপজীব্য করে সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক রচনা করেন ‘বাংলার মাটি বাংলার জল’। প্রযোজনা করেছে নাট্যদল ‘পালাকার’, নির্দেশনা দিয়েছেন শামীম সাগর।

ক্রাচের কর্নেল
কথাশিল্পী শাহাদুজ্জামানের উপন্যাস ‘ক্রাচের কর্নেল’ থেকে নাট্যরুপ পেয়েছে নাটক ‘ক্রাচের কর্নেল’।যেখানে একইসাথে একটি দেশ কিংবা একটি নাটকের দল খুঁজে বেড়ায় ইতিহাসের ভুলে যাওয়া এক নায়ককে। বিপ্লবের ব্যর্থ স্বপ্ন বোনা সামরিক বাহিনীর অবসর পাওয়া কর্নেল তাহের এমনই এক নায়ক।  নাটকের গল্প আবর্তিত হয় ছোটবেলার সাহসী ছেলে তাহেরের রণাঙ্গনের অকুতোভয় যোদ্ধা কর্নেল তাহেরে রূপান্তরের কথা। ‘বটতলা’-এর জন্য উপন্যাসটির নাট্যরূপ দিয়েছেন সৌম্য সরকার ও সামিনা লুৎফা নিত্রা। নির্দেশনা দিয়েছেন মোহাম্মদ আলী হায়দার।

পঞ্চনারী আখ্যান
কেবল ‘নারী’ নয়, তার পরিচয় হোক ‘মানুষ’। সমাজের চিরকালীন বৈষম্যকে অতিক্রম করে কবে নারী নিজেকে মানুষ বলে অনুভব করতে পারবে- এ আর্তনাদই ধ্বনিত হয়েছে ‘ঢাকা থিয়েটার’-এর প্রযোজনা পঞ্চনারী আখ্যানে।

দ্য আলকেমিস্ট
ব্রাজিলীয় লেখক পাওলো কোয়েলহো’র জগৎখ্যাত উপন্যাস ‘দ্য আলকেমিস্ট’-এর নাট্যরূপ ও নির্দেশনা দিয়েছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষক রেজা আরিফ।প্রযোজনা করেছে ‘জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ’।

মুক্তি
‘থিয়েটার’ প্রযোজিত ও ত্রপা মজুমদার নির্দেশিত নাটক ‘মুক্তি’ বলে সময়ের কথা। মুখর সময়ে একই পরিবারের চার নারী ক্রমশ বিচ্ছিন্ন হয়ে যান একে অপর থেকে। তাদের মনোজগত উন্মোচনের মাধ্যমে মুক্তি প্রশ্ন তোলে- যে মুক্তি মানুষকে বিচ্ছিন্ন করে, তা কি আসলেই মুক্তি?

সার্কাস সার্কাস
একটি সার্কাস দলের ভিতর-বাহিরের সংঘাত ও সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি ‘সার্কাস সার্কাস’। চরিত্ররা প্রতি মুহূর্তেই বারে বারে খুঁজে ফেরে জীবনের সম্ভাব্যতাকে।  ‘প্রাচ্যনাট’-এর দর্শকপ্রিয় এ প্রযোজনাটি রচনা ও নির্দেশনা আজাদ আবুল কালামের। ‘সার্কাস সার্কাস’ নাটকটি উৎসবের সমাপনী দিনে বিকাল ৫টায় প্রদর্শিত হয়।

ওপেন কাপল
‘থিয়েটার’-এর প্রযোজনা ‘ওপেন কাপল’। স্বামী-স্ত্রী’র সামাজিক সম্পর্ক বাঁচিয়ে রাখতে বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্কই কী সমাধান? ভীষণ কৌতুকের মধ্য দিয়ে বিবাহ সম্পর্কে আবদ্ধ দুই নারী-পুরুষ চরিত্র প্রায়শ অনুচ্চারিত এ বিষয়ের দারুণ এক প্রযোজনার অবতারণা করেন দর্শকের সামনে। ওপেন কাপল-ই ছিল এবারের আয়োজনের শেষ পরিবেশনা। দারিও ফো ও ফ্রাঙ্কা রামের রচনায় নাটকটির রূপান্তর ও নির্দেশনা দিয়েছেন সারা যাকের।

সম্পূর্ণ বিনামূল্যে অনলাইন নিবন্ধনের মাধ্যমে পাঁচ দিনে দশটি নাটক উপভোগ করেন দর্শকরা।