নিজের সময় তো বটেই, পরের সব প্রজন্মকেই প্রভাবিত করেছেন রক অ্যান্ড রোলের রাজা এলভিস প্রিসলি। শুধুমাত্র গান দিয়ে নয়, ব্যক্তিত্বের আবেদন, পোশাক, স্টাইল সব মিলিয়ে এলভিস যেন ছিলেন এক চকোলেট কেক।
ভারতের বাংলা গানের বিখ্যাত শিল্পী অঞ্জন দত্তের ম্যারি অ্যান গানের পঙক্তি থেকেই এলভিসের প্রভাব আঁচ করা যায়, ‘মাথার ভেতরে ছিল এলভিস প্রিসলি, খাতার ভেতর তোমার নাম’। এখনো অনেকের মাথার ভেতরেই এলভিস প্রিসলি দিব্যি গান করে যাচ্ছেন!
এলভিসের জন্ম মিসিসিপির টুপেলোতে। বেশ গরিব পরিবারের সন্তান ছিলেন। জীবিকার জন্য ট্রাক চালিয়েছেন এক সময়। গান গাওয়ার শুরুটা বাবা-মার সাথে চার্চে। এরপর শখের বসেই ১৯৫৩ সালে মেমফিস স্টুডিওতে গিয়ে নিজের পয়সায় কিছু গান রেকর্ড করেন, মাকে জন্মদিনের উপহার হিসেবে দেওয়ার জন্য।
বছরখানেক বাদে মেমফিস স্টুডিওর মালিক স্যাম ফিলিপস ডেকে পাঠান এলভিসকে। বেশ কিছু গান রেকর্ড করান তাঁকে দিয়ে। কান্ট্রি, রিদম অ্যান্ড ব্লুজ ধরণের গান দিয়ে যাকে বলে এলভিস একেবারে সম্মোহিত করে ফেলেন স্টুডিওর মানুষদেরকে। সেখান থেকেই শুরু।
এলভিসই প্রথম আমেরিকান শ্বেতাঙ্গ ও কৃষ্ণাঙ্গদের মধ্যে যে সাংস্কৃতিক পার্থক্য বা দূরত্ব ছিল সেটাকে একই সুতোয় বাঁধেন। ব্ল্যাক মিউজিকের সাথে শ্বেতাঙ্গ আমেরিকানদের পরিচয় করিয়ে দেন এলভিস। আর এই সঙ্গীত, গায়কী এলভিস ধারণ করেন তার শৈশব-কৈশোর থেকে, টুপেলোর রাস্তাঘাটে শোনা গানগুলো তাঁর ভেতরে রয়ে যায়। এলভিসের জন্ম এবং বেড়ে ওঠার সময়টাতে আমেরিকায় বর্ণবাদ ছিল চরম। বিশেষ করে এলভিস যেখানে বেড়ে উঠেছেন সেই দক্ষিণাঞ্চলে।
শ্বেতাঙ্গ আমেরিকান বিশেষত যারা একটু বয়স্ক তারা বরাবরই বর্ণবাদী ছিলেন। কিন্তু অপেক্ষাকৃত তরুন শ্বেতাঙ্গদের কাছে এলভিস পৌঁছে যান তাঁর গান নিয়ে। গানের পাশাপাশি তাঁর স্টাইল, বিশেষ করে স্টেজে উন্মাতাল পারফরম্যান্স তাঁকে কিশোর থেকে তরুনদের কাছে নিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু যতই এলভিস কিশোর-তরুনদের কাছাকাছি যাচ্ছিলেন ততই আমেরিকার শ্বেতাঙ্গ সমাজ, মিডিয়া, চার্চ এলভিসের নামে ছি ছি করছিল। কিন্তু তাতে কি যায় আসে! মেয়েরা এলভিস বলতে পাগল ছিল আর ছেলেরা চাইতো এলভিসের মত হতে!
১৯৫০ এর দশকে আমেরিকান শ্বেতাঙ্গ সমাজের যে বর্ণবাদী এবং রক্ষণশীল চরিত্র ছিল তাতে জোরেসোরেই আঘাত হানেন এলভিস। আর সে কারণেই বয়স্ক শ্বেতাঙ্গরা এলভিসকে যেমন ঘৃণা করেছেন তেমনি তরুন-কিশোররা ভালোবেসেছে। কারণ কিশোর-তরুনদের কাছে এলভিস ছিল স্বাধীনতার প্রতীক, নিজের মত করে চলার অনুপ্রেরণা।
১৯৫০ ও ৬০ এর দশকে এলভিসের প্রভাব ছিল সর্বগ্রাসী। স্টেজ, টেলিভিশন, সিনেমা সর্বত্রই ছিলেন এলভিস প্রিসলি। ৩১টি সিনেমায় অভিনয় করেছেন তিনি। এলভিসের স্টেজ পারফরম্যান্স নিয়ে সে সময় ব্যাপক সমালোচনা হতো। এমনকি ফ্র্যাঙ্ক সিনাত্রাও এলভিসের সমালোচনা করেছেন এক সময়। স্টেজে এলভিস নিজে যেমন নাচে গানে মেতে উঠতেন তেমনি দর্শকরাও পাগল হয়ে উঠতো এলভিসের জন্য। নতুন গান, নতুন পোশাক এবং নতুন ভাষা নিয়ে মঞ্চে ওঠেন এলভিস। তাঁর ডাকটেইল হেয়ারকাট, ওপেন নেক শার্ট তাকে সেই সময়ের বাকিদের থেকে আলাদা করেছিল।
এলভিস নিজে অবশ্য বলেছেন, ‘মানুষ নতুন কিছু খুঁজছিল, আর আমি ঠিক সেই সময়েই হাজির হই। আমি ভাগ্যবান ছিলাম’।

১৯৫৬ সাল নাগাদ এলভিস পুরো আমেরিকাজুড়েই জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। ১৯৫৫ সালের ১৩ মে ফ্লোরিডার জ্যাকসনভিলের বেজবল পার্কে এলভিসের একটি কনসার্ট ছিল। কনসার্ট শেষে এলভিস বলেন, ‘মেয়েরা তোমাদের সাথে ব্যাকস্টেজে দেখা হবে’। এমনিতেই মেয়েরা এলভিস বলতে পাগল ছিল, সেই এলভিসই যখন তাদের ডাক দিয়েছে তখন আর তাদের থামায় কে! এলভিসের ড্রেসিংরুমে হুমড়ে পড়েছিল সবাই। ড্রেসিংরুমের ছোট এক জানালা দিয়ে হাত বাড়িয়ে সবাই এলভিসকে ছুঁতে চাচ্ছিলো। যারা একটু কাছাকাছি পৌঁছে গেছিলো তারা এলভিসের জামাকাপড় টেনে ছিড়ে ফেলছিল। আর যারা এলভিসের কাছাকাছি যেতে পারেনি তারা এলভিসের সাদা লিঙ্কন কন্টিনেন্টাল গাড়ির শরীরজুড়ে তাদের ফোন নাম্বার লিখে দিয়ে গিয়েছিল ভালোবাসার বার্তাসমেত।

১৯৫০ এর দশকজুড়ে রক এন রোল, রিদম অ্যান্ড ব্লুজ আমেরিকান তরুনদের কাছে দারুন জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। আর এই জনপ্রিয়তার কেন্দ্রে ছিলেন এলভিস প্রিসলি। এলভিসের কল্যাণেই আমেরিকান শ্বেতাঙ্গরা আফ্রিকান আমেরিকান মিউজিকের সাথে পরিচিত হয় এবং তা শুনতে শুরু করে। বর্ণবাদী সেই সময়কার সমাজে সেটা ছিল এক সাংস্কৃতিক বিপ্লব।
শুধু যে সাংস্কৃতিক বিপ্লবই ঘটেছে এলভিসের গানের মাধ্যমে তা নয়। সামাজিক পরিবর্তনও ঘটেছে। আর সেটা ঘটেছে ১৯৫০ ও ৬০ এর দশকের শ্বেতাঙ্গ আমেরিকান তরুনদের মধ্যে। সে সময় আমেরিকায় বর্ণবাদ যেমন ছিল তেমনি অর্থনৈতিকভাবেও দেশটি ক্রমাগত এগিয়ে চলছিল। আর এই তরুনরা আর তাদের বাবা-মার পুরোনো ধ্যান ধারণা মেনে চলতে রাজি ছিল না। তারা নিজেদের স্টাইল, নিজেদের জীবন যাপনের তরিকা নিজেরাই ঠিক করে নিয়েছিল। নিজেদের মত প্রকাশ করতে শিখেছিল কোন রাখঢাক ছাড়াই, আর তাদের মধ্যে এই স্বাধীনচেতা মনোভাব ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন এলভিস তাঁর গান ও লাইফস্টাইল দিয়ে।
কালক্রমে এলভিস শুধু আমেরিকান তরুনদেরই নন, সারা বিশ্বের তরুনদের কাছে আইকন হয়ে ওঠেন। এলভিসের মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে তাঁর গানের রেকর্ডস বিক্রি হয় অন্তত ৫০ কোটি কপি। ১৬ আগস্ট ছিল এলভিস প্রিসলির প্রস্থানের দিন। রক এন রোলের মহারাজা পৃথিবী থেকে ৪১ বছর আগে বিদায় নিয়েছেন যে সর্বগ্রাসী প্রভাব এখনো বিদ্যমান। তাইতো আমাদের মাথার মাঝে ঘোরে এলভিস প্রিসলি, খাতায় ওঠে ম্যারি অ্যানের নাম।