মুখ থাকতে হাতে কি!

ক’দিন আগে আফগানিস্তানে মাঠভর্তি দর্শকের ভিড়ে আত্মঘাতী বোমা বিস্ফোরণে নিহত হয়েছেন আটজন। যে টুর্নামেন্টের খেলা চলাকালীন এই আত্মঘাতী হামলা হয় সেই টুর্নামেন্টের নাম ‘রমজান কাপ’, অর্থাৎ রোযার মাসকে ঘিরে ছিলো এই বিশেষ ক্রীড়া প্রতিযোগিতা। অবশ্য ধর্ম আর ক্রিকেটের মিশেলের ফলাফলেই যে এই হামলা তা কিন্তু না, গত বছরের সেপ্টেম্বরেও আফগানিস্তানের ক্রিকেট মাঠে একই ধরনের হামলায় প্রাণ দিয়েছিলেন আরও তিনজন। খেলাধুলা নিয়ে এহেন বোমাবাজি যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তানে নাকি নৈমিত্তিক ঘটনা!

আফগানে ক্রিকেট চলে কড়া নিরাপত্তায়, যদিও এর মাঝেই ঘটে আত্মঘাতী হামলা

সৈয়দ মুজতবা আলী আফগানিদের খুব পছন্দ করতেন। কারণ তারা আড্ডাবাজ তবে একইসাথে বেশ অলস এবং রগচটা। উপরন্তু, নানারকম রাজনৈতিক মারপ্যাঁচে দেশটা ঐতিহাসিকভাবেই উত্তপ্ত। অথচ দেড় শতাব্দী আগেও এই ভারতবর্ষে ক্রিকেট আর ধর্মের মিশেল হতো। ইংরেজরা তাদের কলোনিতে ক্রিকেট ছড়িয়ে দেওয়ার পর সবার আগে ক্রিকেটকে আপন করে নেয় পারসিরা। এরপর সিরিয়ালি হিন্দু, মুসলিমসহ অন্যরা। আর সাতচল্লিশের স্বাধীনতার পূর্বে ভারতের সবচেয়ে জনপ্রিয় ক্রিকেট টুর্নামেন্টটি হতো ধর্মের ভিত্তিতে! এখনকার দিনে ব্যাপারটি আশ্চর্যের শোনালেও, হিন্দু, মুসলিম, পার্সি, ইংরেজ আর রেস্ট অব দ্যা পিপল (মূলত দেশীয় খ্রিস্টানদের নিয়ে গড়া দল, এই দলের অন্যতম সেরা খেলেয়াড় ছিলেন ভারতের অন্যতম সেরা ব্যাটসম্যান বিজয় হাজারে) এই পাঁচটি দল নিয়ে বসতো ক্রিকেটের এই জমজমাট আসর।

পেন্টাঙ্গুলার টুর্নামেন্টের জন্য বিখ্যাত বোম্বের জিমখানা মাঠ

একে পরাধীন দেশ, তার উপরে ক্রিকেটের উত্তেজনার সঙ্গে যুক্ত হতো ধর্মের জোশ। বিপদ তো ঘটবারই কথা! অথচ ইতিহাস সাক্ষী দিচ্ছে- পেন্টাঙ্গুলার নামে পরিচিত সেই টুর্নামেন্টের সাথে খুব বড়সড় কোন দাঙ্গার ইতিহাস মিশে নেই, মানুষ মারা তো দূরের। পেন্টাঙ্গুলার শুধু নয়, এরপর থেকে কলকাতায় মোহনবাগান-ইষ্টবেঙ্গল (সেইখানেও ঘটি-বাঙ্গালের লড়াই) থেকে অল্প কিছুদিন আগেও ঢাকায় আবাহনী-মোহামেডান খেলা নিয়ে দেখা যেত টানটান উত্তেজনা। দুই দলের সমর্থকদের মধ্যে অফুরন্ত গালি আর ঠাট্টার বিনিময়। টুকটাক মারামারি যে হতো না, তা নয়, তবে খুনোখুনির ব্যাপারটা অবশ্য ছিলো না।

অথচ ক্যাথলিক আর প্রোটেস্ট্যান্টদের দুই স্কটিশ ক্লাব সেল্টিক আর রেঞ্জার্সের মধ্যে গত এক শতকে অন্তত ৪৩টা খুনের হদিস পাওয়া যায়। ধারণা করা হয়, এর বাইরেও অনেক খুন খারাপির আসল কারণ এই দুই ক্লাবের সমর্থকদের মধ্যে অনন্য সাপে-নেউলে সম্পর্ক। ইংল্যান্ড-ইটালির হুলিগানিজম তো পুরো দুনিয়াতেই কুখ্যাত। Heysel Stadium disaster লিখে গুগল করলে এক নির্মম কাহিনিরও খোঁজ পাওয়া যাবে, যার ফলাফল ছিলো ৩৯টি জলজ্যান্ত প্রাণ। সাবেক কমিউনিস্ট শাসিত পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোতেও এ ধরণের কাহিনীর সন্ধান সহজলভ্য।

হেইজেল ডিজাস্টারের তুলকালাম

অথচ, বাঙালি নাকি হুজুগে। তাহলে খেলাকে নিয়ে বাঙালির খুন-খারাপির হদিস মেলে না কেন? কারণটা কি হতে পারে? উত্তরটা খুবই বিতর্কিত শোনালেও সম্ভবত এই বদ্বীপ অঞ্চলের মানুষের পরস্পরকে গালাগালি আর ঠাট্টা মশকরার অভ্যাস! খানিকটা ধাঁধার মতো শোনাচ্ছে ব্যাপারটা, না? চলুন একটু ব্যাখা দেওয়া যাক।

কয়েক লক্ষ বছর ধরে হান্টার-গ্যাদারারের জীবনযাপন করা হোমো স্যাপিয়েন্সের জীবনে শিকার কেবল যে খাবার জোটানোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিলো তাই না, সেটি ছিলো তাদের বিনোদনও। এই বিনোদনের মাধ্যমেই প্রশমিত হতো উত্তেজনা আর সামাজিক প্রাণি বলে বিবেচিত হলেও আদতে মানুষের গঠন তো আর পিঁপড়া বা মৌমাছির মতো না, ফলে সে ‘প্রাকৃতিক’ ভাবে সামাজিক না। প্রতিটি ব্যক্তিই আলাদা, আবার এসব আলাদা সত্ত্বাদের নিয়েই সমাজ। ফলে একই সঙ্গে সমাজের মৈত্রী বজায় রাখা যেমন মানুষের ধর্ম, নিজেকে তুলে ধরাও তার একটা উদ্দেশ্য। নিজেকে আলাদা করে তুলে ধরার সুযোগটাই এনে দিতো শিকার। সেই শিকারের ধারায় পরবর্তীতে আসলো নানা শারীরিক কসরত-খেলা। এক সময়ে কেবল অংশগ্রহন না, খেলা দেখার মাধ্যমেও এই বিনোদন, এই উত্তেজনা প্রশমনের জরুরি ব্যাপারটি সম্পন্ন হতো, রোমের কলোসিয়ামে গ্ল্যাডিয়েটরদের সঙ্গে বুনো পশুর লড়াই যার একটি দারুন উদাহরণ। এই লড়াইয়ে যে রক্ত দেখার নেশা, খুন দেখার বাসনা, সেটা কিন্তু সেই উত্তেজনা প্রশমনেরই একটা মাধ্যম। আর নগর সভ্যতার নানারকম স্ট্রেসের সঙ্গে সঙ্গে এই প্রশমন নগরবাসী/নাগরিকদের জীবনে আরো বেশি বাঞ্ছনীয় হয়ে পড়ে। যাকগে, সংক্ষেপে বললে, ব্যাক্তি ও সমাজে এই উত্তেজনার প্রশমন অত্যাবশ্যক। এবার আসা যাক, এটি কিভাবে করা যায় তা নিয়ে। রোমান কলোসিয়ামের রক্তাক্ত লড়াই দেখে রোমানরা উত্তেজনা প্রশমন করতেন। আধুনিক নগরবাসীও সেই উপায়ই খোঁজে।

কলোসিয়ামের রক্তাক্ত লড়াই

স্কটিশ কিংবা আফগানীরা গোমড়ামুখো হওয়ায় তাদের রাগ প্রশমিত হয়না, ফলে সেটি যখন ফুলে ফেঁপে ফুটে যায় তখন ব্যাপারটা খুনোখুনিতে যেয়েই থামে, কিন্তু বাঙালি মুখে মারিতং জাতি হিসেবে গালাগাল আর ঠাট্টার মাধ্যমেই শক্তিক্ষয় করে বলে উত্তেজনার প্রশমন শেষমেশ খুনোখুনি পর্যায়ে গড়ায় না। এখন অনেকেই বলতে পারেন যে, এই ঝগড়া, এই ঠাট্টা, এই গালাগাল তো খুবই অস্বস্তিকর, কিন্তু ভেবে দেখুন, খুন-খারাপির চেয়ে তো এটি ভালো! এই ভাবেই রাগমোচন (উভয়ার্থে) অন্তত রক্তমোক্ষণের চেয়ে উত্তম পন্থা নয়কি?

২০১৮’র রাশিয়া বিশ্বকাপ সম্ভবত ‘মেম’ বা ‘অনলাইন ট্রলের’ স্বর্ণযুগে হতে যাওয়া প্রথম বিশ্বকাপ, অন্তত বাংলা মুলুকে তো বটেই। ফলে এই নিয়ে এক কুরুক্ষেত্র হবে তা নিয়ে সন্দেহের বিন্দুমাত্র অবকাশ নেই। সময়ে সময়ে সেটা যে মাত্রা ছাড়াবে সেটা নিয়েও আশংকা রয়েছে।

ক্যাপশনে ব্রাজিল সমর্থকরা লিখতেই পারেন ‘চোরের মার বড় গলা’

তবে বাঙালি রসিক জাতি, বাঙালি জানে তিন ইঞ্চির জিহবার সামনে সাতফুটিয়া বীরত্ব আদপে কিছুই না। সে কারণেই, মানব জাতি প্রাণিজগত নিয়ন্ত্রণ করে আর অতিকায় ডায়নোসর লোপ পেয়েছে। তাই এবারের বিশ্বকাপ জুড়ে আরো বেশি করে ট্রল-পালটা ট্রল চলুক। মেমের বন্যায় কাপ ভেসে যাক। খালি মনে রাখতে হবে, হাত-পা চালানোর বদলে জিহবা চালানোই জ্ঞাণীর লক্ষণ। জ্ঞানীর বচন হচ্ছে, মুখ থাকতে হাতে কি! হ্যাপি ট্রলিং।