২০১৪ থেকে ২০১৮। চার বছরের অপেক্ষা! ২০১৪-য় যখন ‘বাড়ি তার বাংলা’র ট্রেলার প্রথমবারে ধরাধামে আসে। তারপর অপেক্ষা শুরু মুভিটা দেখার জন্য। কিন্তু স্যার, সে অপেক্ষাই সার। ওয়েটিং লাইনেই দাঁড়িয়ে রইলাম, অনলাইনে আর দেখা মেলে না। কী টরেন্ট, কী ডিরেক্ট, কোনো লাইনেই তার সাইন নেই। বেলায় বেলায় ট্রেলার দেখে বুড়িয়ে গেলাম। শেষমেশ ধরেই নিয়েছিলাম হয়তো উৎসাহজাগানো একটি মুভি না দেখার হতাশার হুতাশনই সঙ্গী হবে বাকি জীবন।

তা কী এমন ছিলো ট্রেলারে যার জন্য এমন আগ্রহ? কারণগুলো নিজস্ব যদিও। প্রথম কারণ টপিক। অদ্যাবধি ফরমায়েশি লেখার সাথে থাকা একজনের ব্যক্তিগত আগ্রহটা অনুমেয়। তো ফরমায়েশি লেখা পরম-আয়েসীভাবে নিত্য প্রসব করতে পারেন এমন একজন ভদ্রলোক ওয়ান ফাইন মর্নিংয়ে আবিষ্কার করলেন তিনি আর লিখতে পারছেন না। ঘোরতর এ সমস্যার সমাধানের জন্য শরনাপন্ন হয়েছেন সুন্দরী এক সাইক্রিয়াটিস্টের। এটুক বোঝার পরই একটাই বক্তব্য থাকে- শাট আপ অ্যান্ড টেক মাই মানি। দ্বিতীয়ত, ট্রেলারজুড়ে ‘পান’-এর ছড়াছড়ি। আহা, এ ‘পান’ সে পান নয়। ইংরেজি পি-ইউ-এন পান। যার মানে হলো একটা শব্দের উদোর পিঠে কাছাকাছি উচ্চারণের, কিন্তু অন্য আরেকটি অর্থ তৈরি করতে পারে এমন কোনো শব্দ-বুধো চাপিয়ে কিঞ্চিত মজার অবতারণা। এইরকম আরো ‘পান’-এর নেশায় ও আশায় ‘বাড়ি তার বাংলা’ করে তুললো নেশাতুর। তৃতীয়ত, প্রাতঃস্মরণীয় সুকুমার রায়ের ভুরি ভুরি রেফারেন্স। বলছি কি নামটাই তো সুকুমার থেকে নেওয়া। ‘বাংলা ও বাঙালির আবোল-তাবোল’ ইতিহাস ট্যাগলাইনে দেখে বায়ে-ডাইনে না তাকিয়ে ‘বাড়ি তার বাংলা’ দেখার ইচ্ছে মনে যখন শাশ্বত, তখন চতুর্থ কারণটাও শাশ্বত-ই। শাশ্বত চ্যাটার্জি। যাকে চেনা ছোটবেলা থেকে, সব্যসাচী যখন ‘ফেলুদা’ হয়ে প্রথম মাঠে নামে, তখন তিনি যে তোপশে। যদিও তপেশ হিসেবে ‘শাশ্বত’ কখনই প্রথম চয়েস হবেন না, তিনি এরপর ব্যোমকেশ-এর সহকারী ‘অজিত’ও হয়েছেন। কিন্তু শাশ্বত শত চরিত্র করলেও শাশ্বত-র সত্য ভক্তি জন্মে ‘কাহানি’র বব বিশ্বাস, ভূতের ভবিষ্যতের হাতকাটা কার্তিক আর অবশ্যই অবশ্যই ‘গোয়েন্দা শবর’ দেখে। থ্রিলার-গোয়েন্দা গল্পের ফ্যান হিসেবে তাই স্যরি টু সে, এক্ষেত্রে বায়াসড। ‘শবর’ হয়ে এই পয়তাল্লিশোর্ধ্ব বয়সেও তিনি যে দৌড়ঝাঁপ করছেন, আর পাঞ্চলাইন ডেলিভারিতে তার যে টাইমিং! উফ্! নাহ্, তিনখানা ‘শবর’ নিয়ে জবরদস্ত একখানা লেখা এখন সময়ের শুধু না, নিজের কাছে নিজের দাবি। ওহো, রাইমা সেনের কথাটা মিস্ করে গেছি মাইরি। থাক সে কথা। চলুন উৎসাহ-উস্কানিয়া চার বছর পুরনো ট্রেলারটি দেখে নিই আরও এক ঝলক।

তারপর যখন ‘বাড়ি তার বাংলা’র কথা স্মৃতিদ্রুম থেকে বেমালুম গুম হয়ে গিয়েছিলো, তখনই এক অ্যানাদার বিউটিফুল মর্নিংয়ে গরম-গরম ফেসবুকখানার পাতা যখন হাতড়ে সাঁতরে যাচ্ছি, একটা পোস্টে নজর আটকে গেলো। ফেসবুকের একটা গ্রুপে একটা মুভি রিভিউ। প্রথম দু-তিন লাইন থেকেই জানা গেলো ‘বাড়ি তার বাংলা’ এখন বাংলা-সহ সারাবিশ্বের ইন্টারনেটে সুলভ। বাকি রিভিউ পড়া বাদ দিয়ে, পাইরেটেড ডাউনলোড সংক্রান্ত নীতিবাক্য ভুলে সব নৈতিকতা বিসর্জন দিয়ে অল্প সময়েই ডাউনলোড করে এরপর টানা দু’ঘন্টা দেখে-টেখে শান্ত হলাম। এতটাই অ্যাটাচড ছিলাম যে এর মাঝে যে নানাবিধ জটিল (অবশ্যই প্রাপ্তবয়সী) সমস্যার নিশ্চিত বিরক্তিউদ্রেককারী বিজ্ঞাপনের সমারোহ ছিলো, সেগুলোকেও সমস্যাই মনে করিনি।

দেখার পর প্রথম প্রশ্ন। চার বছরের যে অপেক্ষায় রয়েছিলাম সে অপেক্ষার মূল্য কি ঠিকঠাক উসুল হয়েছে? উত্তরটা হলো, হয়তো প্রত্যাশা যতোটা আকাশচুম্বি ছিলো, ‘বাড়ি তার বাংলা’র প্যাকেজ সেই হাইরাইজের টপ ফ্লোরে উঠতে পারেনি। তবে বাংলা চলচ্চিত্রে বাংলা শব্দ নিয়ে এতো বেশি খেলা বহুদিন দেখিনি। শেষ বোধহয় ভূতের ভবিষ্যতে দেখা গিয়েছিলো। আর অতোটা ‘পান’ পড়েছিও শেষ বোধহয় শিবরামের লেখাতেই।

এবার আসি গল্পে। ট্রেলার দেখে মোটামুটি ধারণা পেয়েছেন। মুখ্য চরিত্র রূপচাঁদ সেন। তিনি একজন প্রডিজি। হুম, ছোটোবেলা থেকেই ভাষায় তার বেজায় দখল। যেমন তেমন দখল? মুখের বাংলা বোল ফোটে চার মাস বয়সেই। স্কুল যাবার শুরুর দিনগুলোতেই তার অমর সৃষ্টি- “বাঘের জামার অল্প দাম, নেইকো কলার, নেই বোতাম”। আরো যেগুলো আছে সেগুলোও তুখোড়। তবে উল্লেখের উপযুক্ত নয়। তো রূপচাঁদের দক্ষতা ঠাহর করতে পেরে তার মা তাকে ঘিরে দেখতে থাকে স্বপ্ন। তার আশা ভাষার এই দখল দেখিয়ে ছেলে একদিন সত্যজিত রায়ের মতোই নামকরা কেউ হবে। বাংলা ভাষার ঘাড়ে চেপে নানা ইন্ডাস্ট্রিতে এই দখলদারিত্ব কায়েমের চেষ্টা ঘিরেই সিনেমার গল্প। রূপচাঁদ আর তার মা’র টার্গেটেড প্রথম ইন্ডাস্ট্রি- অ্যাডভার্টাইজিং। তাতে শুরু থেকেই রূপচাঁদ এমন দাপট দেখাতে থাকেন একপর্যায়ে অবস্থা দাঁড়ায় কবিগুরুর পরে নাকি তিনিই, অ্যাডগুরু। আর কপিরাইটার রূপচাঁদের কপিগুলোও দুর্দান্ত। এ.বি দাসের রসগোল্লা- ‘টিপে নিয়ে চুষে খান’, সুপার ক্লিন ডিটারজেন্ট বার- ‘চরিত্রের দাগ ছাড়া বাকি সব সাফ’, কিংবা পঞ্জিকার জন্য লেখা- ‘দুই মলাটে ললাট লিখন’। সবগুলো হয়তো বিজ্ঞাপনের এথিকসের সাথে মিলবে না। তবে স্যাটায়ারিস্টিক মুভি বিবেচনায় একদম টু দ্য পয়েন্ট।

যদিও বিজ্ঞাপনে রূপচাঁদের গুরুবিদ্যার সুখ বেশিদিন সইলো না। তা সত্ত্বেও ভাষার বোলে দখলদারিত্ব কায়েমের লড়াই অব্যাহত থাকলো। টুকটাক নানা কাজের পর রূপচাঁদের এক ক্যাম্পেইন স্লোগানে মৃতপ্রায় দলও ইলেকশনে জিতে চলে গেলো ক্ষমতায়। আর রূপচাঁদও হয়ে গেলেন সে দলের সভাকবি। ভালোই চললো ক’দিন। তারপর আবার পালাবদল। তারপর আবার অন্য ফিকির। শেষে তো ওই সব হারিয়ে সাইক্রিয়াটিস্টের কাছে ধর্ণা দেওয়া। কী হলো এরপর? কীভাবে নিজেকে ফিরে পেলো রূপচাঁদ? নাকি ফরমায়েশ পূরণ করতে করতে নিজেকে চিরতরেই হারিয়ে ফেললো এই বোল-রাজ? সবমিলে নানারঙা হলদে-মেরুন ওরাংওটাংয়ের দ্বন্দ্বে চিৎপটাং এক বাঙালির গল্প ‘বাড়ি তার বাংলা’।

বাড়ি তার বাংলা-এর পোস্টার

শাশ্বত চ্যাটার্জি যারপরনাই ক্ষুরধার। রাইমা সেন-ও তাই। ভালো ছিলো রূপচাঁদের মায়ের চরিত্রে রূপদানকারী তুলিকা বসুর অভিনয়ও। আর চার বছর বাদে এসে পরিচালক রঙ্গন চক্রবর্তীর পরিচালনা ভালো না খারাপ তা বিচারের মানে দেখছি না।

তাহলে ‘বাড়ি তার বাংলা’র কমতিটা কীসে?

ওই যে ওই চার বছরের গ্যাপে। ওটা ধর্তব্যে না নিলে বাংলা ভাষায় লেখালেখি বা পড়াপড়ির সাথে যারা জড়িয়ে আছেন, পেশাগত বা নেশাগত যে হিসেবেই হোক, তাদের সবার জন্য ‘বাড়ি তার বাংলা’ হতে পারে দুই ঘণ্টার উপভোগ্য বিনোদন।

Statistics graduate and a business student who is now a full-time thinker, observer, daydreamer, procrastinator in advertising and part-time reader, writer and movie lover in life.