আজব- জবর আজব এক খেলা ফুটবল। চামড়ার ক্ষুদ্র এক গোলকের মাঝে কোথাও লুকিয়ে থাকে স্বাধীনতা (পড়ুন বার্সেলোনা), কোথাও লুকিয়ে থাকে শ্রেণি সাম্যের বারতা (পড়ুন লিভারপুল)। আধুনিক ফুটবল ইতিহাস অসামান্য-অনন্য কিছু মুহূর্ত উপহার দিয়েছে জগতকে। তেমন কিছু অসামান্য মুহূর্তকেই ধরবার চেষ্টা হয়েছে এই লেখায়।

“স্করপিয়ন কিক (Scorpion Kick)”

হিগুইতার কিম্ভুতকিমাকার সেভ

সবাই আদর করে ডাকত ‘এল লোকো’। স্প্যানিশ যে শব্দের অর্থ ‘পাগল’, বলা যায় ‘খ্যাপাটে’-ও। নইলে কি আর গোলপোস্টের নিচে দাড়িয়ে বল সহজভাবে হাত দিয়ে ধরে ফেলার বদলে পা দিয়ে শট মারতে যান!! সেটাও আবার স্বাভাবিক কোনো শট নয়! শরীরটাকে উল্টো ঘুরিয়ে, পায়ের পাতা দিয়ে চোখ কপালে তুলে দেওয়ার মতো কিক! ফুটবল বিশ্বে যা পরিচিত ‘স্করপিয়ন কিক’ নামে। এই ‘খ্যাপাটে’ মানুষটির নাম রেনে হিগুইতা। ২২ বছর আগে, ১৯৯৫ সালের ৬ সেপ্টেম্বর অদ্ভুত এই শটের জন্ম দিয়েছিলেন তিনি। লন্ডনের ওয়েম্বলিতে এক প্রীতি ম্যাচে ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হয়েছিল কলম্বিয়া। পেনাল্টি বক্সের বেশ বাইরে থেকে গোলপোস্টে শট নিয়েছিলেন ইংল্যান্ডের মিডফিল্ডার জেমি রেডন্যাপ। হাওয়ায় ভেসে আসা বলটা সহজেই হাত দিয়ে ধরতে পারতেন কলম্বিয়ার গোলরক্ষক হিগুইতা, পারতেন ফিস্ট করতেও। পোস্টে ধেয়ে আসা বল অদ্ভুত ঢঙে শরীর ঘুরিয়ে বিপদমুক্ত করার চিন্তা কীভাবে একজন গোলরক্ষকের মাথায় আসতে পারে, তা ভেবে অবাক না হয়ে উপায় নেই। ২২ বছর আগের সেই অদ্ভুত কিক দিয়ে ফুটবল-ইতিহাসে একটা আলাদা জায়গা করে নিয়েছেন তিনি। হিগুইতা সম্পর্কে আরেকটি তথ্য: গোলরক্ষক হলেও তিনি প্রায়ই নিতেন ফ্রি-কিক। মাঝে-মাঝে পেনাল্টিও। কলম্বিয়ার জার্সি গায়ে ৬৮ ম্যাচে তিনটি গোলও রয়েছে তার। লাতিন আমেরিকান ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা এই গোলকিপার বর্তমানে কাজ করছেন সৌদি আরবের আল নাসরি ক্লাবের গোলকিপিং কোচ হিসেবে।

“এটাই জীবনের শেষ নয় (Life Doesn’t End Here)”

এসকোবারের জীবনের সম্ভবত একমাত্র ভুল

ফুটবল ভক্তদের কাছে এখনও এক ট্র্যাজেডির নাম আন্দ্রেস এসকোবার। ফুটবল মাঠে করা ভুলের প্রায়শ্চিত্ত কলম্বিয়ান ফুটবলারকে করতে হয়েছিলো নিজের জীবন দিয়ে। ২৩ বছর আগের সেই ঘটনা, এলোমেলো করে দিয়ে ছিল মাঠ ও মাঠের বাইরের ফুটবল জগতকে। বিশ্বকাপের ব্যর্থতার কারণে মাত্র ২৭ বছর বয়সে নিজের জীবন হারান এস্কোবার। ১৯৯৪ বিশ্বকাপ শুরুর আগে ডার্ক হর্স হিসেবে বিবেচিত কলম্বিয়া চূড়ান্ত আসরে গ্রুপ পর্বও পেরোতে পারেনি। গ্রুপে নিজেদের শেষ ম্যাচে আয়োজক ইউএসএর কাছে ২-১ গোলে হারে তারা। ম্যাচের ৩৫ মিনিটে আত্মঘাতী গোল করে বসেন কলম্বিয়ার ডিফেন্ডার আন্দ্রেস এসকোবার। ফুটবল নিয়ে জুয়ার স্বর্গভূমি ল্যাটিন অ্যামেরিকায় ম্যাচের ফলাফল নিয়ে জুয়াড়িদের লাখ লাখ ডলার যায় জলে। দেশে ফেরার মাত্র এক সপ্তাহের মাথায় ২ জুলাই নির্মম ভাবে হত্যা করা হয় তাকে। ধারণা, জুয়ায় বড় ক্ষতি মেনে না নিতে পেরে মাফিয়া চক্রই করেছে এই হামলা। অথচ ম্যাচ হারার পর এসকোবার নিজেই তার টিমমেটদের বলেছিলেন “Life doesn’t end here”। আশায় ছিলেন তার ভুলের পরেও খেলাপাগল দেশের মানুষ তার পাশেই দাঁড়াবে। দাঁড়িয়েছিল কলম্বিয়ার মানুষ, প্রায় এক লাখ ২০ হাজার কলম্বিয়ান অংশ নিয়েছিলেন এসকোবারের শেষকৃত্যে।  এত বছর পরেও ঐ দিনটি গভীর শোকের সঙ্গে স্মরণ করে কলম্বিয়ানরা।

“ফ্লাইং কিক (Flying kick)”

কিং ক্যান্টোনার মেজাজ হারানো, মাশুল গুণলো ক্রিস্টাল ফ্যান

ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় এরিক ক্যান্টোনার কুখ্যাত এই ঘটনা অনেকেরই অজানা। কিং ক্যান্টোনা ছিলেন বিশ্বকাপ না খেলা এক অসম্ভব বেহিসাবি ফুটবল মেধা। ১৯৯৫ সালে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড এবং ক্রিস্টাল প্যালেসের মধ্যকার লিগ ম্যাচে প্রতিপক্ষের প্লেয়ারকে মারাত্মক ট্যাকেলের কারণে রেড কার্ড দেখতে হয় ক্যান্টোনাকে। মাঠ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময়, একজন ক্রিস্টাল ফ্যান ভার্বালি ক্যান্টোনার সাথে মিসবিহেভ করে। মাত্রই রেড কার্ড পাওয়া ক্যান্টোনা মেজাজ ধরে রাখতে না পেরে ফ্লাইং কিক মেরে বসেন ওই ক্রিস্টাল ফ্যানকে। এই অনভিপ্রেত ঘটনার কারণে পরবর্তীতে প্রিমিয়ার লিগে চার ম্যাচের জন্য নিষিদ্ধ করা হয় তাকে।

“তোমাকে ভালোবাসতাম বলেই আজ এত ঘৃণা (We hate you because we loved you)” 

এমনকি শুয়োরেরও কৃতজ্ঞতা থাকে

সিআর-৭ পূর্ববর্তী পর্তুগালের ইতিহাসের সেরা খেলোয়াড়, বার্সেলোনা ফ্যানদের ফেভারিট লুই ফিগো ২০০০ সালে কাতালোনিয়া থেকে পাড়ি জমান মাদ্রিদে, রিয়ালের ঘরে। ফুটবলারদের ট্রান্সফার খুবই স্বাভাবিক একটা বিষয় হলেও, এই ট্রান্সফারটা মন থেকে মেনে নেয়নি বার্সেলোনার সমর্থকরা। ওই সিজনের ট্রান্সফার উইন্ডোতে মাদ্রিদের ক্লাব সভাপতি ঘোষণা দিয়েছিলেন লুই ফিগোকে কেনার। কিন্তু বার্সেলোনা নিজেদের সেরা প্লেয়ারকে বিক্রি করতে মোটেও আগ্রহী ছিলোনা। ফিগোও নাকি বার্সা কর্তাদের আশ্বাস দিয়েছিলেন বার্সেলোনাতেই থাকবেন বলে। ফিগোর আশ্বাসের ভিত্তিতেই বার্সেলোনা তখনই কন্ট্রাক্ট রিনিউ করেনি। এই সুযোগটাই নিয়েছিল মাদ্রিদ কর্তৃপক্ষ। ফিগোর ওই ট্রান্সফারের পর থেকে এখন পর্যন্ত বার্সেলোনা এবং মাদ্রিদের মধ্যে সরাসরি ট্রান্সফার বন্ধ। অকস্মাৎ সে ঘটনায়, বার্সেলোনা ফ্যানদের কাছে নায়ক থেকে খলনায়ক বনে যান লুই ফিগো। বার্সা ফ্যানদের চূড়ান্ত ক্ষোভের প্রকাশ ঘটে রিয়ালের জার্সিতে ফিগো এল ক্লাসিকো খেলতে বার্সেলোনার মাঠ ন্যু ক্যাম্পে আসলে। ফ্যানরা ফিগোর দিকে গ্যালারি থেকে বিভিন্ন জিনিষ ছুঁড়ে মারতে থাকে। খেলার একপর্যায়ে কর্নার নিতে আসলে গ্যালারি থেকে শুকরের মাথা ছুঁড়ে মারা হয় ফিগোর দিকে। বার্সা ফ্যানরা ফিগোকে কখনোই ক্ষমা করেনি, করবে বলেও মনে হয়না, ফ্যানদের মত, “We hate you, because we loved you”

“মিলানের বুকে এক খণ্ড নরক (Hell In Milan)” 

দিনশেষে ফুটবল একটা খেলা, লড়াই নয়

“Hell In Milan” Despite the madness surrounding their rival supporters, this photograph shows a sense of footballing brotherhood between the two players ছবিটাকে ফুটবল ইতিহাসের ওয়ান অব দ্যা মোস্ট পাওয়ারফুল মুহূর্ত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ২০০৫ সালে ইউসিএলের কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচে ফেস অফ হয় দুই চির প্রতিদ্বন্দ্বী ইন্টার এবং এসি মিলানের। দুই দলেরই হোম ভেন্যু (সান সিরো) একটি হওয়ায় ফ্যানেদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল চরমে। ম্যাচটিতে ইন্টার মিলান ০-৩ এগ্রিগ্রেটে পিছিয়ে ছিল, এবং তাদের একটি গোল বাতিলও করা হয় প্রটেস্টের কারণে। এর পরই মূলত এক টুকরো নরক নেমে আসে মিলানের মাটিতে। গ্যালারি থেকে বৃষ্টির মতো পড়তে থাকে একের পর এক ফ্লেয়ার এবং মিসাইল। একটি মিসাইলতো এসি মিলানের কিপার ব্রআজিলিয়ান কিংবদন্তি দিদার মাথায় আঘাতও করে, ফলে ৭৩ মিনিটের সময় খেলা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হন রেফারি। পুরো গ্যালারি জুড়ে যখন দুই দলের সমর্থকেরা খণ্ড যুদ্ধে ব্যস্ত, ঠিক ওইসময় মাঠের অপর প্রান্তে দুই প্রতিদ্বন্দ্বী খেলোয়াড় মার্কো মাতেরাজ্জি, রুই কস্তার কাঁধে হাত দিয়ে খেলা শুরুর জন্য অপেক্ষা করতে থাকেন।

এবারের বিশ্বকাপে, রাশিয়ায়-পুতিনের দেশে আমরা যেন ফুটবলের মিলনাত্মক রূপটুকুই পাই। এটুকুই প্রত্যাশা।