হালদা

এফডিসি প্রতিষ্ঠার পর প্রথম কাজ শুরু হয়েছিল আসিয়া-র। চলচ্চিত্রটির জন্য বাছাই করা হয়েছিল গ্রামীণ প্রেক্ষাপটের এক পরিণতি না পাওয়া প্রেমের গল্প। নায়ক-নায়িকা ছিল ছোটবেলার খেলার সাথী। পরে তাদের মধ্যে প্রেম হয়। কিন্তু পরিস্থিতির কারণে নায়িকার বিয়ে হয়ে যায় চাচার সাথে। সেই বিয়ে অবশ্য তাদের প্রেমের সমাপ্তি ঘটাতে পারে না। তাদের এই গোপন প্রেমের দৃশ্যগুলো ছাঁটা-না ছাঁটা নিয়ে চলচ্চিত্রটির মুক্তিই আটকে গিয়েছিল।

সিকোয়েন্সগুলোর বক্তব্য প্রদানের অভিসন্ধি লুকানো যায় নাই

প্রায় একই রকম এক প্রেমের গল্প নিয়ে তৈরি হয়েছে হালদা। চরিত্রগুলোর সবাই হালদা পাড়ের বাসিন্দা। হালদার এক মাঝির (ফজলুর রহমান বাবু) জীবন বাঁচিয়ে তার বাড়িতে স্থায়ী আসন লাভ করে এক বাবা-মা মারা যাওয়া ছেলে (মোশাররফ করিম)। সেই ছেলের সাথে বন্ধুত্ব থেকে প্রেম হয়ে যায় সেই বাড়ির মেয়ের (তিশা)। কিন্তু বাবার দায়মোচনের মূল্য হিসেবে তাকে বিয়ে করতে হয় এলাকার এক ক্ষমতাশালী লোককে (জাহিদ হাসান)। তবে তাতেও তাদের প্রেমের পরিসমাপ্তি ঘটে না। চলতে থাকে গোপন প্রেম। ওই আসিয়া-র মতোই।

বিয়ের পরেও তাদের প্রেমের পরিসমাপ্তি ঘটে না

অবশ্য কাহিনির পরের অংশটুকু বেশ আকর্ষণীয়। জালালের গল্প-তে তৌকির অভিনীত চরিত্রটি ছিল আটকুঁড়ে, মানে তার সন্তান হয় না। তৌকিরের হালদা-য় আবার জাহিদ হাসান অভিনীত চরিত্রটি একই রকম, তারও সন্তান হয় না। সন্তানের আশাতেই তিশাকে তার দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করে। কিন্তু তিশা যখন সন্তানসম্ভবা হয়, জাহিদ হাসান অভিনীত চরিত্রটির সন্দেহ হতে থাকে, সন্তানটি অন্য কারো। সেই সন্দেহের সুযোগ নেয় তার প্রথম স্ত্রী (রুনা খান)। এভাবে কাহিনি চূড়ান্ত পরিণতির দিকে এগোতে থাকে।

এই মূল গল্পের সাথে জুড়ে দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে হালদা নদীর আর্তনাদ। মানুষের হাতে কীভাবে মাছের প্রাকৃতিক এই প্রজনন ক্ষেত্র ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, আশেপাশের ইট ভাঁটার বর্জ্য নির্দ্বিধায় ফেলা হচ্ছে নদীতে, তাই নিয়ে সাধারণ মানুষ সোচ্চার হলেও জাহিদ হাসানের চরিত্রটির মতো ক্ষমতাশালীরা সে ব্যাপারে কী ভীষণ নির্বিকার, ইত্যাদি দেখানো হয়েছে।

দ্বিতীয় স্ত্রী সন্তানসম্ভবা হলে স্বামীর সন্দেহ হতে থাকে, সন্তানটি অন্য কারো

প্রবণতাটি যে বেশ প্রশংসার যোগ্য, তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু সমস্যা হলো, এই বক্তব্যধর্মী সাব-প্লটটিকে ঠিক যথার্থভাবে মূল গল্পের অংশ করে তোলা যায় নাই। অল্প কিছু জায়গা বাদ দিলে, প্রায়শই দৃশ্যগুলোকে বিচ্ছিন্ন মনে হয়েছে এবং সিকোয়েন্সগুলোর বক্তব্য প্রদানের অভিসন্ধিও লুকানো যায় নাই।

সোজা বাংলায় বললে, এই যে দুইটা প্যারালাল গল্প বলার চেষ্টা করা হয়েছে, সেই দুই গল্প তেল-জলের মতো আলাদা থেকে গেছে, মিশ খায়নি। ওই হালদা নদীর মতোই। ফলে হালদা নদীতে যেমন ইদানিং মাছেরা আর স্বচ্ছন্দ বোধ করে না, দর্শকদেরও ওই দৃশ্যগুলোতে তেমনই অনুভূতি হয়েছে।

চলচ্চিত্রটিতে হালদা পাড়ের লোকজ সংস্কৃতির উপস্থাপন করা হয়েছে

আবার হালদা পাড়ের মানুষদের যে সংকটগুলো দেখানো হয়েছে, সেগুলোও সর্বদা ঠিক জুতসইভাবে দেখানো যায়নি। যেমন হালদার মা মাছ মারা নিয়ে যে সংস্কার দেখানো হয়েছে, যে সংস্কার ভাঙার অনুশোচনা পুরো সিনেমায় বাপ-মেয়েকে তাড়িয়ে বেড়ায়, সেই সংস্কারটা আগে দর্শকদের কাছে পরিস্ফূট করা তো হয়ইনি, ঠিক কোন পরিস্থিতিতে বাবা সংস্কারটা ভাঙলেন, সেটাও ঠিকঠাক প্রতিষ্ঠিত করা হয়নি।

চলচ্চিত্রটিতে অবশ্য আরেকটি প্রশংসার্হ প্রচেষ্টাও আছে- হালদা পাড়ের লোকজ সংস্কৃতির উপস্থাপন। নৌকাবাইচ, বলি খেলা তো বটেই, চলচ্চিত্রটিতে বিভিন্ন ছুঁতায় কাওয়ালি ও কবিগানের আসরও দেখানো হয়েছে। কাওয়ালির আসরটির উপস্থাপন বেশ ভালো হলেও কবিগানের আসরটি তুলনায় বেশ বিবর্ণ লেগেছে। তবে বক্তব্য বিবেচনায় হওয়ার কথা ছিল উল্টো; হালদা পাড়ে শিল্পায়ন বনাম তার ফলে সৃষ্ট দূষণ নিয়ে বাহাসের কবিগানের উপস্থাপনটি হালদা-র প্রবণতার কারণেই ভীষণ গুরুত্ব দিয়ে চিত্রায়িত করা জরুরি ছিল।

চলচ্চিত্রটিতে নদীকেন্দ্রিক সৌন্দর্যের উপস্থাপিত হয়েছে

এই ধরনের ইত্যাকার ত্রুটি-বিচ্যূতি থাকার পরেও দর্শক-সমালোচকদের মধ্যে হালদা-র প্রতি এক ধরনের অনুরাগ কাজ করেছে। তার অন্যতম কারণ তৌকিরের পূর্বতন চলচ্চিত্র অজ্ঞাতনামা-র প্রতি অবিচার। পাশাপাশি চলচ্চিত্রটিতে নদীকেন্দ্রিক সৌন্দর্যের বিশদ উপস্থাপনও করা গেছে। সাথে ভালো কাস্টিংয়ের ফলাফল হিসেবে গড়পরতা সিনেমাগুলোর চেয়ে ভালো অভিনয় ইত্যাদি মিলিয়ে অপ্রচলিত ধারার সিনেমা হয়েও বেশ ব্যবসা করেছে হালদা।

আর কিছু না হোক, হালদা যে অন্তত ফর্মুলার বাইরে থেকেও হলে-সিনেপ্লেক্সে বেশ কিছু সংখ্যক দর্শক টানতে পেরেছে, তাতেও খানিকটা তৃপ্ত হওয়ার অবকাশ আছে। কারণ, সম্প্রতি বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত যে হলমুখী হচ্ছে, এবং তার ফলে প্রথাগত ফর্মুলার বাইরের চলচ্চিত্রের যে দর্শক তৈরি হচ্ছে, সে ধারা অক্ষুণ্ণ রাখতেও এই ধরনের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক চলচ্চিত্র দরকার এবং সেগুলোর অন্তত গড়পরতা ব্যবসা করাটাও দরকার।

mm
Nabeel Onusurjo

Author, Journalist and Freelance Writer in Dhaka, Bangladesh