নেড অফ হাউজ স্টার্কঃ নিভৃতনায়কের গল্প

প্রথম পর্ব-  এয়রিস ও টাইউইন: মুখোশবন্ধুদের গল্প

দ্বিতীয় পর্ব – রেয়গার ও লিয়ানা : ভ্রান্তিবসন্ত, নীল গোলাপ আর নেকড়েমানবীর গল্প

এক অতীত স্বপ্ন ফিরে এল তার ঘুমের ভেতরে। সে স্বপ্নে তার সামনে এসে দাঁড়াল সাদা পোশাকের তিনজন নাইট, ভেসে উঠল ভেঙে ফেলা একটি মিনার, আর লাল ফুল ফুটে থাকা বিছানায় শোয়া লিয়ানা।

সেই স্বপ্নের ভেতর তার সাথে ছয়জন বন্ধুও ঘোড়ায় চড়ে এসেছিল। মনে পড়ে না এমন এক সুদূর অতীতেও ছিল তারা সবাই। তার সাথে ছিল জোরির বাবা মার্টিন কাসেল, ছিল থিও উলের মত বিশ্বস্ত সহচর, ছিল ব্র্যান্ডনের স্কয়ার ইথান গ্লোভার, আর ছিল মৃদুস্বরে কথা বলা নরম হৃদয়ের স্যার মার্ক রিসওয়েল। ছিল ক্র্যানোগম্যান হাওল্যান্ড রিড, ছিল লাল তাগড়া ঘোড়ায় চড়া লর্ড ডাস্টিন। নেড তাদের প্রত্যেকের মুখ যেন নিজের মুখের মতোই নিবিড়ভাবে চিনত। সেদিন সে মনে মনে শপথ করেছিল, এদের মুখ কখনো ভুলবে না। কিন্তু সময়ের ঘুণপোকা প্রতিজ্ঞা বোঝে না। সেই স্মৃতি ক্ষয়ে গেছে ধীরে ধীরে। এদের মুখ এখন তার স্বপ্নে শুধুই ছায়ার মতো, কুয়াশা-ঘোড়ার ‘পরে ধূসর প্রেত।

স্বপ্নে তাদের সাত জনের মুখোমুখি ছিল তিনজন যোদ্ধা। বাস্তবেও ছিল তারা তিনজন, রাজরক্ষীর রাজকীয় পোশাকে। ডর্নের লালাভ পাথুরে পাহাড়ের পাদদেশে গোল মিনারের নিচে তারা তিনজন অপেক্ষা করছিল। তাদের সাদা পোশাক বাতাসে উড়ছিল। স্বপ্নের ভেতরেও তাদের মুখ ছিল দিবালোকের মতো স্পষ্ট। স্যার আর্থার ডেইন, ‘প্রভাত তরবারি’। তার মুখে এক বিষণ্ণ হাসি ঝুলছিল। গ্রেটসোর্ড ড’নের হাতলটা তার ডান কাঁধের পেছন থেকে উঁকি দিচ্ছিল। পাশেই স্যার অসওয়েল হোয়েন্ট হাঁটু গেঁড়ে বসে তলোয়ারে শান দিচ্ছিল। মাথায় ধাতব-শুভ্র শিরোস্ত্রাণের ওপর তার হাউজের প্রতীক পাখা ছড়ানো কালো বাদুড়ের চিহ্ন আঁকা। আর এই দুইজনের মাঝে দাঁড়িয়ে ছিল দুর্ধর্ষ স্যার জেরোল্ড হাইটাওয়ার, ‘শ্বেত বৃষ’, রাজরক্ষীদের লর্ড কমান্ডার।
“ট্রাইডেন্টে তোমাদের দেখবো ভেবেছিলাম,” নেড বলল।

“ওখানে আমরা যাইনি,” উত্তর দিল স্যার জেরোল্ড।

“আমরা থাকলে ওই বিশ্বাসঘাতকটার কপালে শনি ছিল,” স্যার অসওয়েল্ড বলে উঠল।
নেড পাত্তা দিল না, “কিংস ল্যান্ডিংয়ের পতন হল, স্যার জেইমি সোনার তলোয়ার দিয়ে তোমাদের রাজাকে খুন করল, ভাবছিলাম তোমরা কোথায় ছিলে তখন।”

“বহুদূরে,” স্যার জেরোল্ড বলল, “নইলে এয়রিস এখনো সিংহাসনেই থাকতেন, আর আমাদের ওই প্রতারক ভাইটাকে নরকে পাঠাতাম।”
নেড বলল, “স্টর্মস এন্ড পর্যন্ত এসে টাইরেল আর রেডওয়াইন লর্ডদের অবরোধ উঠিয়ে দিয়েছি। তারা আর তাদের সব নাইটেরা মাথা হেঁট করে নতি স্বীকার করেছে। আমাদের প্রতি আনুগত্য জানিয়েছে। ধরেই নিয়েছিলাম তোমরা সেখানে থাকবে।”

স্যার আর্থার ডেইন এতক্ষণে বলে উঠল, “আমাদের মাথা এত সহজে হেঁট হয় না।”

নেড বলল, “শুনলাম স্যার উইলেম ড্যারি তোমাদের রাণী আর রাজপুত্র ভিসেরিসকে নিয়ে ড্রাগনস্টোনে পালিয়েছে। ভেবেছি তোমরাও ওদের সাথে পালিয়েছো।”

স্যার অসওয়েল বলল, “স্যার উইলেম সৎ হলেও রাজরক্ষী না। রাজরক্ষীরা কখনো পালায় না।”

“কখনোই না!” শিরোস্ত্রাণ পরতে পরতে বলল স্যার আর্থার।

“আমরা আমরণ যুদ্ধের শপথ নিয়েছি,” স্যার জেরোল্ড ব্যাখ্যার সুরে বলল। নেডের পাশে ছায়াসঙ্গীরা ধীরে এসে দাঁড়াল। সকলের হাতে খোলা তলোয়ার। সাতজন বনাম তিনজন।

“আর এখন এই যুদ্ধ শুরু হল,” বলল প্রভাত তরবারি স্যার আর্থার। তার হাতে একটানে উঠে এলো ড’ন, খাপখোলা ধারালো উজ্জ্বল আলো-উদ্ভাসিত তলোয়ার।

বিষাদমাখা কণ্ঠে বলল নেড, “না! এখন এই যুদ্ধ শেষ হবে।”

তীক্ষ্ণ ঝনঝন শব্দে ঝড় উঠল ছায়ার সাথে কায়ার, তলোয়ারের সাথে তলোয়ারের। এরই মাঝে সে শুনতে পেল লিয়ানার কাতর চিৎকার, “এডার্ড!” রক্তিম আকাশ জুড়ে মৃত্যুর শীতল চাহনির মতো নীল গোলাপের পাঁপড়ি ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে।

“এডার্ড!” আবার চিৎকার।

“কথা দিচ্ছি,” ফিসফিস করে বলল নেড, “লিয়ানা, আমি কথা দিচ্ছি…”

চন্দ্রমিনারে নিজের শয্যাকক্ষের সাথে লাগোয়া টানা বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে জন অ্যারিন। ঈরি প্রাসাদের সবচেয়ে উঁচু এই মিনারে তার শোবার ঘর। এই বারান্দা থেকে পেঁজা তুলোর মতো মেঘের নিচে উপত্যকাটা দেখাই যায় না। মাঝে মাঝে একটানা নিচে তাকিয়ে থাকলে ঘোর লাগে, মনে হয় মাথা ঘুরে পড়ে যাবে। জনের হাতে একটা চিঠি। একটু আগে কিংস ল্যান্ডিং থেকে কুচকুচে কালো দাঁড়কাক এসেছে, অশুভদর্শন পাখিটার মতোই খারাপ খবর নিয়ে। ঘোর অমানিশার আলামত। রাজা এয়রিস লিখে পাঠিয়েছেন, অতিসত্ত্বর তাকে কিংস ল্যান্ডিং যেতে হবে। উইন্টারফেলের লর্ড রিকার্ড স্টার্ক এবং তার বড় ছেলে ব্র্যান্ডন স্টার্ককে দেশদ্রোহিতার অপরাধে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন রাজা। ব্র্যান্ডন স্টার্ক সাথে দুইশ বিদ্রোহী সৈন্য নিয়ে গিয়েছিল। তাদেরকেও আটক করা হয়েছে। এদের মধ্যে ছিল এলবার্ট অ্যারিন, লর্ড জন অ্যারিনের উত্তরসূরী। এয়রিস তাকেও হত্যা করার নির্দেশ দিয়েছে। এ চিঠি আসতে আসতে এরা কেউই এখন আর বেঁচে নেই। ষাটোর্ধ্ব বৃদ্ধ নিঃসন্তান জনের একমাত্র ভাতিজা, অ্যারিন বংশের একমাত্র ভবিষ্যৎ এলবার্ট আর নেই। তার দুই পালক পুত্রসম রবার্ট আর নেড, তাদের দুজনের বাবারাই এখন মৃত। স্টেফন বেশ কয়েক বছর মারা গেছে। এয়রিসের ছেলে রাজপুত্র রেয়গারের জন্য সে কনে খুঁজতে গিয়েছিল এসোসে। সে রাতে তার ছেলে রবার্ট আর স্ট্যানিস স্টর্মস এন্ড থেকে দেখছিল। কীভাবে তাদের বাবা-মায়ের জাহাজ ন্যারো সি-এর উদ্দাম ঝড়ে তীরে ভেড়ার আগেই টুকরো টুকরো হয়ে গিয়েছিল। সেই থেকে রবার্ট অ্যারিনের কাছে বড় হচ্ছে, সাথে তার সমবয়সী এডার্ড ওরফে নেড।

বৃদ্ধ হলেও জনের রক্তের তেজ এখনো কমেনি। চিঠিটা আবার খোলে সে, “বিশ্বাসঘাতকতা”, “দেশদ্রোহিতা”! এয়রিস পুরোপুরি উন্মাদ হয়ে গেছে, মনে মনে ভাবে জন অ্যারিন, লর্ড অফ ভেইল, ওয়ার্ডেন অফ দ্যা ইস্ট। রবার্ট আর নেডের অভিভাবক বলে কেউ আর রইলো না। শুধু সে আছে। তার বংশও হয়তো তার মৃত্যর সাথে সাথেই বিলুপ্ত হয়ে যাবে। নিজের অজান্তেই চোয়াল শক্ত করে ফেলে লর্ড জন অ্যারিন। এয়রিস! আগুন নিয়ে খেলছো তুমি!

“এয়রিস উন্মাদ। তার রাজা হয়ে থাকার যোগ্যতা নাই। ওকে সরাতে হবে।” খুব শান্ত স্বরে থেমে থেমে একটা একটা করে শব্দ উচ্চারণ করে লর্ড জন অ্যারিন। সামনে রবার্ট আর নেড দাঁড়িয়ে আছে। এরই মধ্যে চিঠির খবরটা পেয়ে গেছে তারা। কথা শেষ করে জন তাদের দিকে তাকালো, নিছকই আঠারো-উনিশ বছরের টগবগে দুই তরুণ। ওরা কি পারবে? ওরা কি বুঝতে পারছে কী ঘটতে চলেছে? প্রথমে মুখ খুললো রবার্ট – একহারা গড়ন, বিশালদেহী, লম্বায় ছয় ফুট ছাড়ানো, মাথা ভর্তি কালো চুল, “আমি শুধু রেয়গারকে চাই। সে আমার লিয়ানাকে অপহরণ করেছে! ওকে উচিত শাস্তি দিব আমি! পুরো সাত রাজ্য জানবে আমার লিয়ানাকে অপহরণের শাস্তি কী!”

“না, এখন মাথা গরম করার সময় না, রবার্ট। ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করো,” জনের গলা এখনো শান্ত।

উত্তেজনায় ফুঁসে ওঠে রবার্ট, “মাথা গরম বলছেন কেন? আপনিই তো বললেন এয়রিসকে সরাতে হবে। পুরো টারগারিয়েনদেরই শেষ করে দিতে হবে। এই অত্যাচারী উন্মাদটার জন্য আমার বাবা মরেছে। আর আজ নেডের বাবাকে মেরেছে, ব্র্যান্ডনকে মেরেছে, এলবার্টকেও মেরে ফেলেছে! এখন এই চিঠিতে বলেছে আমাকে আর নেডকে মেরে কাটা মাথা তার কাছে পাঠাতে! আপনি বুঝতে পারছেন না?”

এতক্ষণে এই প্রথম মুখ খুললো নেড, “আমাদের স্রেফ আর একটা রাজ্য লাগবে,” বলে সরাসরি জনের দিকে তাকালো সে, “এখানে আমরা তিনজন নর্থ, ভেইল, আর স্টর্মল্যান্ডসের লর্ডদের এক করতে পারবো। বেশিরভাগই আমাদের নেতৃত্ব মেনে নিবে, কেউ কেউ টারগারিয়েনদের অনুগত থাকবে, তাদেরকে দমাতে হবে। রাজার পক্ষে যাবে শুধু ডর্ন আর রিচ। জেইমির কারণে টাইউইনও তাকে সমর্থন দেবে না। তবে আমি টাইউইনের সাহায্য নিতে চাই না। তার নিজের স্বার্থ না থাকলে সে কাউকে সাহায্য করে না। বাকি রইলো রিভারল্যান্ডস আর আয়রন আইল্যান্ডস।”

জন চুপচাপ নেডের কথা শুনছিল। তার শান্ত স্থিতধী রূপ দেখে জন একইসাথে বিস্মিত ও আনন্দিত। মাথা গরম ব্র্যান্ডন বা উদ্দাম রবার্টের তুলনায় এই ছেলেটা যেন পুরোপুরি বিপরীত কোন ধাতুতে গড়া। একটু আগে জেনেছে তার বাবা আর বড় ভাই বেঁচে নেই। উইন্টারফেলের দায়িত্ব এখন তার, যে দায়িত্ব কোনদিন তার ওপর এসে পড়বে সে ঘুণাক্ষরেও ভাবে নি। মাত্র সপ্তাহ দুয়েক আগে তার বাবা রিকার্ড রিভারল্যান্ডসের পথে রওনা দিয়েছিল ব্র্যান্ডনের বিয়ের উদ্দেশ্যে। রিভাররানের হস্টার টালির মেয়ে কেইটলিনের সাথে ব্র্যান্ডনের বিয়ে ঠিক হয়েছিল। এজন্য হ্যারেনহালের টুর্নামেন্টের পর ব্র্যান্ডন আর নর্থে ফেরেনি। নেড ফিরে এসেছিল ভেইলে একটা জরুরি কাজে। এর মাঝে সব ওলটপালট হয়ে গেল। অথচ তার শান্ত কিন্তু নির্বিকার চেহারা দেখে তা বোঝার কোন উপায় নেই।

সেদিনই বিদ্রোহের প্রথম স্ফূলিঙ্গ গোপনে জ্বলে উঠলো ঈরির সেই সুউচ্চ মিনারকক্ষে। নিজ নিজ ব্যানারম্যানদের সৈন্যবাহিনী জড়ো করতে উত্তরপানে নেড রওনা দিল, আর রবার্ট রওনা দিল দক্ষিণে। লর্ড অ্যারিন ভেইলের ব্যানারম্যানদের সৈন্যবাহিনী জড়ো করার আহ্বান জানাল। এমন না যে এক ডাকেই সব ব্যানারম্যান সাড়া দিল। অনেকেই বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াল। প্রথম প্রতিরোধ এলো গালটাউনের তরফ থেকে। নেড আর রবার্টের পরিকল্পনা ছিল ঈরি থেকে দক্ষিণ-পূর্বের বন্দর গালটাউন থেকে সমুদ্রপথে যার যার রাজ্যের দিকে রওনা দিবে। কিন্তু বিধি বাম। টারগারিয়েনদের অনুগত হাউজ গ্র্যাফটন এই গালটাউন বন্দরেই অন্যান্য হাউজদের সাথে নিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। লর্ড অ্যারিনের ডাকে সাড়া দেয়া হাউজদের সৈন্য নিয়ে দ্রুত গালটাউন আক্রমণ করে, সাথে ছিল রবার্ট। যুদ্ধক্ষেত্রে প্রচণ্ড আগ্নেয়গিরির মতো ফেটে পড়ে রবার্ট আর তার বিশাল যুদ্ধহাতুড়ি। প্রায় নিজের সমান লম্বা এই অস্ত্রের একদিকে চারকোনা প্রকাণ্ড হাতুড়ি, আর অন্যদিকে সূচালো ধারালো ধাতব কাঁটা – দুই হাতে ধরে প্রচণ্ড জোরে বনবন করে ঘোরাতো রবার্ট। যেদিকের বাড়িই লাগুক না কেন, তা সে ঘোড়া হোক আর মানুষ, তার আর দ্বিতীয়বার দাঁড়ানোর ক্ষমতা থাকতো না। গালটাউনে অল্প কয়েকটি হাউজের এই প্রতিরোধ অ্যারিন আর রবার্টের বাহিনী সহজেই উড়িয়ে দিল। রবার্ট এই বন্দর থেকে রওনা দিল দক্ষিণে স্টর্মস এন্ডের উদ্দেশ্যে।

সামারহলের যুদ্ধ

ততদিনে নেড ঈরি থেকে উত্তরে রওনা দিয়েছে। দুর্গম ‘মাউন্টেনস অফ দ্যা মুন’ পেরিয়ে প্রায় লুকিয়েই সে হোয়াইট হার্বারে পৌঁছে যায়। হোয়াইট হার্বারের হাউজ ম্যান্ডারলি বরাবরই স্টার্কদের অনুগত, তাই সেখান থেকে উইন্টারফেলে যেতে নেডের তেমন কোন কষ্টই হল না। গালটাউন থেকে রবার্টের নিজ রাজ্য স্টর্মল্যান্ডে পৌঁছাতে যদিও অনেক সমস্যা হয়েছিল। উত্তরে স্টার্কদের প্রভাব আর ক্ষমতা অন্যরকম। বিশেষ করে তাদের হাউজের বর্তমান আর ভবিষ্যৎ লর্ড – দুইজনকেই রাজা এয়রিস একই সাথে হত্যা করেছে। পুরো নর্থ বিষয়টাকে নিজেদের ওপর আঘাত হিসেবে নিয়েছে। এই ক্ষুব্ধ জনগোষ্ঠীকে একত্রিত করতে নেডের তেমন কোন বেগই পোহাতে হয় নি। কিন্তু রবার্টের রাজ্যের পরিস্থিতি ভিন্ন ছিল। তখনও সেখানে টারগারিয়েনদের অনেকেই সমর্থন করতো। রাজধানীর সবচেয়ে কাছের রাজ্য হওয়ায় অনেক রাজ্যই সরাসরি রাজপরিবারের বিরোধিতা করতে চায়নি। রবার্ট তাই এসেই গুপ্তচরের মাধ্যমে জানতে পারে তিনটি হাউজ আলাদা আলাদাভাবে ভাবছে টারগারিয়েনদের সমর্থনে একত্রিত হবে, তারপর স্টর্মস এন্ডে আক্রমণ বা অবরোধ করে বসবে।

সৌভাগ্যক্রমে রবার্টের ছোট ভাই স্ট্যানিস আগে থেকেই স্টর্মস এন্ডে সৈন্য জড়ো করে প্রস্তুত ছিল। রবার্ট এসেই সেই বাহিনী নিয়ে ‘সামারহল’ আক্রমণ করল। স্টর্মস এন্ডের পশ্চিমে সামারহল এক ভগ্নপ্রায় টারগারিয়েন প্রাসাদ। এখানেই সেই তিন হাউজের সৈন্যদের আসার কথা ছিল। রবার্টের বাহিনী যখন সেখানে গিয়ে পৌঁছায় তখন এক হাউজের বাহিনী ইতোমধ্যে এসে গিয়েছিল। সরাসরি আক্রমণে তারা পর্যুদস্ত হলো। বাকি দুই হাউজের সৈন্যরা এসেই বিনা প্রস্তুতিতে রবার্টের বাহিনীর সামনে পড়ল। একই দিনে পরপর তিনটি দ্রুত বিজয় রবার্টের জন্য যেমন উৎসাহের ছিল, তেমনি তার অনুসারী হাউজ ও সৈন্যদের কাছেও ছিল গুরুত্বপূর্ণ। এখন আর বিষয়টা নিছক এক হাউজের বিদ্রোহের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। উত্তর থেকে নামছে স্টার্ক, পূর্ব থেকে নামছে অ্যারিন, আর দক্ষিণ থেকে উঠে আসছে রবার্ট।

অ্যাশফোর্ডের যুদ্ধ

এরপর রবার্ট এক বিরাট ভুল করে বসলো। জয়ের দম্ভে উত্তরদিকে গিয়ে স্টার্ক আর অ্যারিনদের সাথে যোগ না দিয়ে সে দক্ষিণ-পশ্চিমদিকে গেল। জানতো না যে সে সামারহলে আসার আগেই দক্ষিণ থেকে রিচ রাজ্যের বিশাল টাইরেল বাহিনী তাকে রুখে দিতে রওনা দিয়েছিল। এই বাহিনীর নেতৃত্বে ছিল জেনারেল র‍্যান্ডিল টার্লি। দুই বাহিনীর সংঘর্ষ হলো অ্যাশফোর্ডে। রিচের সৈন্যবাহিনী সাত রাজ্যের মধ্যেই সর্ববৃহৎ, আর সেই বাহিনীর সম্মুখভাগে ছিল র‍্যান্ডিল টার্লির সৈন্যরা। তাদের তীব্র আক্রমণে রবার্টের বাহিনীর একাংশ ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল। রণক্ষেত্রে রীতিমত মার খেতে লাগল ব্যারাথিয়ন সৈন্যরা। রবার্ট নিজেও আহত হল। অবস্থা বেগতিক দেখে সে দ্রুত সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। অ্যাশফোর্ড থেকে তার সৈন্যের বড় অংশকে নিরাপদে উত্তরের পথে নিয়ে যেতে পারল সে।

টাইরেলদের লক্ষ্য ছিল এয়রিসের হয়ে যুদ্ধজয়। ব্যারাথিয়নরা পিছিয়ে যাওয়ায় হয়তো কিছুটা আত্মতৃপ্তি আর কিছুটা দখলদারিত্বের লোভে টাইরেল বাহিনী স্টর্মল্যান্ডে রওনা দিল। রাজার কাছে খবর পাঠালো রবার্ট অ্যাশফোর্ডে পর্যুদস্ত হয়ে উত্তরে রিভারল্যান্ডের দিকে এগুচ্ছে। আর তারা রবার্টের প্রাসাদ স্টর্মস এন্ড ঘেরাও করতে চলল। স্টর্মস এন্ডে তখন স্ট্যানিস ব্যারাথিয়ন বড় ভাইয়ের হয়ে নেতৃত্ব দিচ্ছিল। টাইরেল লর্ড মেইস টাইরেল তার বিশাল বাহিনী নিয়ে ঠিক এর বাইরেই ঘেরাও করে বসল।

টাইরেলরা স্টর্মস এন্ডের দিকে যাওয়ায় রবার্টের সুবিধাই হল। রিচ রাজ্যের দক্ষিণ থেকে উত্তর পর্যন্ত দীর্ঘ দূরত্ব সে আর তার বাহিনী প্রায় নির্বিঘ্নেই পাড়ি দিতে পারল। ওদিকে উত্তর থেকে স্টার্ক আর পূর্ব থেকে অ্যারিন ব্যানারম্যানদের বাহিনীও ধীরে ধীরে এলাকা জয় করে দক্ষিণে আসছে। তবে এরই মাঝে আরেক বিপদ দানা বেঁধে উঠছিল রবার্টের জন্যে। টাইরেলদের অ্যাশফোর্ড জয়ের কথা কিংস ল্যান্ডিংয়ে পৌঁছে গেছে। এয়রিস তার হ্যান্ড লর্ড জন কনিংটনকে দায়িত্ব দিল রবার্টকে মোকাবিলা করার। উন্মাদ রাজার হ্যান্ড হওয়া দুরূহ কাজ। টাইউইনের পরে ওয়েন মেরিওয়েদারকে হ্যান্ড বানিয়েছিল রাজা। রবার্ট বিদ্রোহ তার অবস্থান নড়বড়ে হয়ে গিয়েছিল। ছয় মাসের মধ্যে তাকে পদচ্যুত করে গ্রিফিন্‌স রুস্টের লর্ড জন কনিংটনকে হ্যান্ড বানাল এয়রিস। ততদিনে রবার্ট স্টর্মল্যান্ডে যুদ্ধ শুরু করে দিয়েছে। তাই জন বিন্দুমাত্র সময় খরচ না করে যুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু করল। কনিংটনের বাড়ি স্টর্মল্যান্ডেই, জায়গাটার নাম গ্রিফিন্‌স রুস্ট। পৌরাণিক গ্রিফিন পাখির প্রতীক তার শিরোস্ত্রাণে। বয়সে তরুণ, রাজপুত্র রেয়গারের বন্ধু এই জন কনিংটন ছিল দৃঢ়চেতা ও একরোখা। রবার্ট অ্যাশফোর্ড থেকে উত্তরে রওনা দিয়েছে জানতে পেরে সে বেশ বড়সড় বাহিনী জোগাড় করে কিংস ল্যান্ডিং থেকে রওনা দিল। অবশেষে রবার্টের বাহিনীকে ধরতে পারল স্টোনি সেপ্ট শহরের কাছে। অ্যাশফোর্ডে আহত রবার্ট তখনও পুরোপুরি সুস্থ হয়নি। কোনমতে গোল্ড রোডটা পেরিয়ে রিভারল্যান্ডের সীমানায় এই শহরে গিয়ে সে এবং তার বাহিনী আশ্রয় নিল। স্টোনি সেপ্ট শহরটা বেশ ছোট। শহরের ভেতর একটা ছোট পাহাড় আছে, যার ওপরে প্রার্থনালয়। এজন্যই শহরের নাম স্টোনি সেপ্ট। শহরের ঠিক মাঝখানে একটা বড় ছড়ানো বাজার আছে। বাজারের কেন্দ্রে একটা গোল ঝর্ণা ছিল, চারিদিকে পানি উঠে গোল হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে দুইটা ট্রাউট মাছকে ঘিরে (ট্রাউট মাছ হাউজ টালির প্রতীক, স্টোনি সেপ্ট শহরে তাই তাদের প্রতীকের ঝর্ণা)। জন কনিংটন তার বাহিনী নিয়ে শহরে ঢোকার আগেই রবার্টের সৈন্যরা বাজারের অলিতে গলিতে লুকিয়ে পড়েছিল। রবার্ট তখনও বিশেষ শুশ্রুষা নিচ্ছিল শহরের পতিতালয় ‘পিচ’-এ লুকিয়ে। জন কনিংটনের সৈন্যরা একটা একটা করে দোকান-পাট ঘরবাড়ি তল্লাশি চালাতে শুরু করল। সেপ্টের সাইলেন্ট সিস্টাররা জোরে জোরে ঘণ্টা বাজাতে শুরু করল। তাদের দেখাদেখি পুরো শহর জুড়েই দোকানে দোকানে ঘণ্টাধ্বনি বেজে উঠল। কানে তালা লেগে যাওয়া শব্দের ঝড়ের মধ্যে জন আর তার সৈন্যরা হন্যে হয়ে  খুঁজছে রবার্টকে। গলিতে গলিতে তার সৈন্যদের সাথে ব্যারাথিয়ন সৈন্যদের খণ্ডযুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। রক্তে রঞ্জিত হলো স্টোনি সেপ্টের পাথুরে পথ। কিন্তু এতকিছুর পরও রবার্টকে পাওয়া গেল না। উল্টো নিঃশব্দে ভোজবাজির মতো উত্তর দিক থেকে এসে হাজির হলো নেড স্টার্ক আর হস্টার টালি। সাথে বিশাল সৈন্যবাহিনী। হতোদ্যম হয়ে পড়া ব্যারাথিয়ন বাহিনী যেন জীবন ফিরে পেল।

এবারে জন কনিংটনের পিছু হটার পালা। হস্টার টালির সামনে দাঁড়ানোর মতো শক্তি বা সাহস তাদের এমনিতেও ছিল না। তাছাড়া রবার্টকে না পেলে এই যুদ্ধে প্রাণক্ষয় ছাড়া আর কিছুই হবে না। জন কনিংটন তবুও একটা শেষ চেষ্টা চালালো। সেই লড়াইয়ে মারা গেল ডেনিস অ্যারিন। এলবার্টের পরে জন অ্যারিনের দূরতম উত্তরাধিকার। ডেনিসের রক্তাক্ত শরীর থেকে তলোয়ার বের করতে করতেই জন কনিংটন দেখল অনেক দূরে পিচ-এর নিচতলার দরজা দড়াম করে খুলে ভেতর থেকে বের হয়ে এল রবার্ট ব্যারাথিয়ন। জন আর ব্যারাথিয়নের মাঝে দু’পক্ষের প্রায় শ’খানেক সৈন্য যুদ্ধরত। রবার্টের ভয়ালদর্শন হাতুড়ির আঘাতে এদিকে ওদিকে ছিটকে পড়ছে টারগারিয়েন সৈন্যরা। এই তুমুল রণক্ষেত্রের মধ্য দিয়ে জন কিছুতেই রবার্টের কাছে পৌঁছাতে পারল না। চতুর্দিকের আক্রমণে তার সৈন্যরা পুরোপুরি বিধ্বস্ত ও দিশেহারা। ঘণ্টাধ্বনির গর্জন যেন সমুদ্রের ঢেউয়ের মত আছড়ে পড়ছে। জন কনিংটনের পরাজয়ের প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী। একসময় ড্রাগনে চড়ে রাজত্ব করা দোর্দণ্ড প্রতাপশালী টারগারিয়েনরা এখন খর্বকায় সাধারণ রাজায় পরিণত হয়েছে, যাদের চাইলেই যুদ্ধে হারানো যায় – এই ধারণা জনমনে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেল। ক্ষিপ্ত এয়রিস জন কনিংটনকে শুধু আগুনে পুড়িয়ে মারা বাকি রাখল। দুর্জনে বলে রেয়গারের বন্ধুকে পুড়িয়ে মেরে এয়রিস তাদের বাপবেটার সম্পর্কের আরো অবনতি চায়নি, তাই কনিংটনকে নির্বাসন দিয়ে ছেড়ে দিয়েছিল। বন্ধুর এমন পরাজয়ের খবর শুনে এই প্রথম রেয়গার ডর্ন থেকে কিংস ল্যান্ডিংয়ে ফিরে এল। পুরো যুদ্ধকালীন সময়ে রেয়গার ডর্নের টাওয়ার অফ জয় নামক মিনারে একপ্রকার আত্মগোপন করেই ছিল। রাজার এহেন দুরাবস্থায় সে রাজধানীতে ফিরে এল, সাথে বড়সড় ডর্নিশ বাহিনী। এয়রিসকে বলল এবার টাইউইনকে আবার হ্যান্ড বানান। সে রবার্টকে ঠিকই শায়েস্তা করতে পারবে। চার চারটা রাজ্য আপনার বিরোধিতা করছে। এটা হেলাফেলা করার ব্যাপার না। এয়রিস শেষবারের মত রেয়গারের পরামর্শকে পাত্তা দিল না। এয়রিস আর টাইউইনের সেই বন্ধুত্বের আজ এমনই অবস্থা যে চরম বিপদেও একজন অন্যজনের সাহায্য চায় না! একসাথে গড়ে তোলা সাম্রাজ্য আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে।

ঘণ্টাধ্বনির যুদ্ধ, স্টোনি সেপ্ট

স্টোনি সেপ্টের নিকটেই টারগারিয়েনদের পলাতক হতোদ্যম অবশিষ্ট সৈন্যরা ঘাঁটি গেড়ে ছিল। এয়রিস তার দুই কিংসগার্ড স্যার ব্যারিস্টান সেলমি আর স্যার জনোথন ড্যারিকে পাঠাল এদেরকে ফিরিয়ে আনতে। রেয়গার রাজধানী আর ক্রাউনল্যান্ডের বাকি সব সৈন্যকে জড়ো করল। কিংসগার্ডের সদস্য লিউইন মার্টেল ডর্ন থেকে দশ হাজার সৈন্য নিয়ে এল। সব মিলিয়ে প্রায় চল্লিশ হাজার সৈন্যবাহিনী নিয়ে রেয়গার এবং তিন কিংসগার্ড রিভারল্যান্ডের দিকে রওনা দিল। বিদ্রোহীদের শিবিরে এখন আনন্দ উল্লাসের পর্ব চলছে। রিভাররানের লর্ড হস্টার টালি বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছে। তার দুই মেয়ে, কেইটলিন আর লাইসার সাথে নেড স্টার্ক আর জন অ্যারিনের বিয়ে ঠিক হয়েছে। চার রাজ্যের সৈন্যসহ বিরাট বাহিনী রিভাররানে এসেছে এই জোড়া বিয়ে উপলক্ষ্যে। এই বিয়ের ধুমধামের মধ্যেই রবার্ট আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দিল – পুরো ওয়েস্টেরোসের সাত রাজ্যের রাজা সে, রবার্ট ব্যারাথিয়ন, আয়রন থ্রোনের দাবি তার। উন্মাদ রাজা এয়রিসকে হারিয়ে সে সিংহাসনে বসবে। তুমুল করতালি আর জয়োল্লাসের মধ্য দিয়ে তার ঘোষণায় সমর্থন জানালো সবাই। এর কিছুদিন পরই বিদ্রোহীদের সম্মিলিত বাহিনী ট্রাইডেন্ট নদীর উত্তরে অবস্থান নিল। নেড আর জন তাদের সদ্যবিবাহিতাদের রেখে এল রিভাররান প্রাসাদের নিরাপত্তায়। নেড চলে যাওয়ার সপ্তাহখানেক পরে কেইটলিন তার ভেতরে এক নতুন প্রাণের অস্তিত্ব অনুভব করল। যুদ্ধের ডামাডোলের ভেতরে মানুষের জন্ম, মৃত্যু, বিয়ে – সবই কত স্বাভাবিক আর তুচ্ছ মনে হয়। এত বড় খবরটা নেডের কাছে পৌঁছালো না, সে তখন কেইটলিন থেকে অনেক দূরে। কেইটলিনের মতই আরেক সন্তানসম্ভবা রেয়গার থেকে অনেক দূরে একাকী শুয়েছিল টাওয়ার অফ জয়ে। তিন কিংসগার্ড তাকে দিনরাত পাহারা দিচ্ছে, দুইতিনজন সহচরী ক্রমাগত সেবা করছে তার, যত্ন নিচ্ছে তার শরীরের। কিন্তু তার মন ভরে আছে রেয়গারের জন্য উদ্বেগে আর দুশ্চিন্তায়। যুদ্ধের ভেতরে সৈন্যরা যাদের অসহায়ভাবে পেছনে ফেলে আসে, তাদের না-জানা গল্পগুলো কোথায় হারিয়ে যায়!

ট্রাইডেন্ট নদী ওয়েস্টেরোসের সবচেয়ে বড় প্রশস্ত আর গভীর নদীগুলোর একটা। উত্তর, দক্ষিণ আর পশ্চিম থেকে তিনটি আলাদা আলাদা নদী এসে মিলিত হয়ে ট্রাইডেন্ট নদীর নাম নিয়েছে। উত্তরের নদীটার নাম গ্রিন ফর্ক, পশ্চিমে ব্লু ফর্ক, আর  দক্ষিণ থেকে এসেছে রেড ফর্ক। রিভাররানের পলল মাটিকে উর্বর করে ট্রাইডেন্ট শেষে পূর্বদিকে বে অফ ক্র্যাবস ধরে ন্যারো সি-তে গিয়ে পড়েছে। তিন ফর্কের মিলনস্থলের কাছেই একটি সরাইখানা – নাম ইন্‌ অ্যাট দ্যা ক্রসরোডস। এই সরাইখানার উত্তরে বিদ্রোহীদের বাহিনী জড়ো হয়েছে। সংখ্যায় তারা চল্লিশ হাজারের কিছু কম বটে, কিন্তু সৈন্যরা বেশিরভাগই অভিজ্ঞ পোড়খাওয়া যোদ্ধা। তাদের কাছে খবর এলো ট্রাইডেন্টের দক্ষিণ থেকে রেয়গারের বিশাল বাহিনী এগিয়ে আসছে। পুরো চল্লিশ হাজার সৈন্যের দল নদীটা পুরোপুরি পার হবার আগেই রবার্টের নেতৃত্বে বিদ্রোহীরা আক্রমণ করে বসল। পূর্বদিকে জন অ্যারিনের বাহিনীর তীব্র আঘাতে লিউইন মার্টেলের ডর্নিশ বাহিনী কিছু বুঝে ওঠার আগেই ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল। মারা গেল লিউইন মার্টেল। অবশিষ্ট সৈন্যরা এদিক ওদিকে ছড়িয়ে পড়ল। পূর্ব থেকে কেন্দ্রের দিকে এগিয়ে জন অ্যারিন দেখল ঠিক মাঝখানে ব্যারাথিয়নের সৈন্যরাও প্রচণ্ড লড়াইয়ে লিপ্ত। আর একদম পশ্চিম প্রান্তে নেড স্টার্ক ও হস্টার টালির সৈন্যরা আক্রমণ করছে কিংসগার্ড সেলমি ও ড্যারির বাহিনীকে। রেয়গার ছিল ঠিক কেন্দ্রের বাহিনীর মাঝখানে। প্রবল পরাক্রমে ঘোড়ার ওপর থেকে কচুকাটা করছিল ব্যারাথিয়ন পদাতিন সৈন্যদের। তার ঝিকিয়ে ওঠা তলোয়ার, রক্তের মতো লাল রুবিখচিত কালো বর্ম, আর ড্রাগনের শিরোস্ত্রাণ অনেক দূর থেকেও ভীতি জাগায়। যেমনি ভীতিকর বিকটাকার হাতুড়ি হাতে চারদিক ধ্বংস করতে থাকা রবার্ট – শিরোস্ত্রাণে বুনো হরিণের ছড়ানো শিং।

এই তাণ্ডবের মধ্যে একসময় রবার্ট আর রেয়গার মুখোমুখি চলে আসে। “রেয়গার!” সর্বশক্তিতে চিৎকার করে ওঠে রবার্ট। ওপরে জ্বলন্ত সূর্যের আলোতে ঝিকিয়ে ওঠে রেয়গারের বর্মের লাল রুবিগুলো। ঘোড়া ঘুরিয়ে তারা একে অপরের দিকে ছুটে আসে। প্রথম আঘাতটা আসে রবার্টের কাঁধের পাশে, রেয়গারের খোলা তলোয়ার অল্পের জন্য শিরোস্ত্রাণ আর বর্মের মাঝখানের ফাঁকটুকু এড়িয়ে যায়। কোনমতে তাল সামলে রবার্ট ঘোড়া ঘুরিয়ে আনে। কাঁধের পাশ টনটন করছে, রক্ষাকবচ ভেঙে হাত দিয়ে সরু একটা রক্তের ধারা নেমে আসে। রবার্ট পাত্তা দেয় না। ডান হাতে হাতুড়ি ঘুরিয়ে আনে রেয়গারের শরীর লক্ষ্য করে, কিন্তু সেও লক্ষ্যে পৌঁছায় না। বাতাস কেটে শিস বাজিয়ে যায় হাতুড়িটা। রেয়গারের পরের আঘাতে রবার্টের পাঁজর বরাবর আরেকটা আঘাত লাগে। আর রবার্টের হাতুড়ি গিয়ে পড়ে রেয়গারের ঘোড়ার গলায়। হুমড়ি খেয়ে হাঁটু গেড়ে বসে ঘোড়াটি, আর ধাক্কায় ছিটকে পড়ে সে। রবার্ট এগিয়ে গিয়ে আবার ঘোড়ার মুখ ঘোরায়। মাটিতে পড়েও সোজা হয়ে উঠে দাঁড়িয়েছে রেয়গার। পাঁজরের আঘাতে বুক ভরে নিঃশ্বাস নিতেও কষ্ট হয়। ঘোড়া থেকে এবার সেও নেমে পড়ে। দু’হাতে শক্ত করে হাতুড়ি উঠিয়ে এগোয়, রেয়গারও ঢাল তুলে আসে, অন্য হাতে সেই দীর্ঘ তলোয়ার। দুজনই পরষ্পরকে একের পর এক আঘাত করতে থাকে, যার কোনটা শরীরে কোনটা বর্মে কোনটা শূন্যে। রবার্ট সবিস্ময়ে বুঝতে পারে রেয়গার ধীরে ধীরে তাকে কব্জা করে ফেলছে। দুই হাতে আঘাত লেগে প্রচুর রক্ত ঝরছে। পাঁজরের সেই তীব্র ব্যথা মাঝে মাঝে চোখ অন্ধকার হয়ে আসছে। রেয়গারের গায়েও আঘাত লেগেছে, কিন্তু তার হাতের ঢালের কারণে এখনো মারাত্মক কোন ক্ষতি হয়নি, শুধু শিরোস্ত্রাণ খুলে গেছে। অবশেষে সুযোগ এলো, রবার্ট অন্ধের মত রেয়গারের ঢালে হাতুড়ি দিয়ে আঘাত হানছিল। এমনই এক আঘাতে এক মুহূর্তের জন্য ভারসাম্য হারাল রেয়গার। হাতের ঢাল সরে গিয়ে বর্মের রুবিগুলো আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে উঠল আর রবার্টের অমোঘ হাতুড়ির তীক্ষ্ণ দিকটা সোজা নেমে এল। নদীর ঘোলাটে জলে ছিটকে টুপ করে ডুবে যেতে লাগল ছিন্নভিন্ন রুবিগুলো। হাঁটু মুড়ে সেখানেই বসে পড়ল রেয়গার। মাথা নিচু। ধীরে থেমে থেমে শ্বাস নিচ্ছে সে। দু’হাতের তলোয়ার আর ঢাল মুঠো খুলে মাটিতে পড়ে গেল। কালো বর্মের রুবিহীন গর্ত থেকে  লাল রক্তের ধারা উপচে বেরিয়ে এল। রবার্ট শেষ শক্তি দিয়ে আরেকবার আঘাত করল রেয়গারের শিরোস্ত্রাণহীন মাথায়।

রবার্ট ও রেয়গার – ট্রাইডেন্ট এর যুদ্ধ

রেয়গারের বিকৃত লাশের চারপাশে সৈন্যরা আতঙ্কে ভয়ে উত্তাল নদীতেই ঝাঁপিয়ে পড়তে শুরু করল। দু’পাশের বিদ্রোহী সৈন্যদের তুমুল চিৎকারে আকাশ বিদীর্ণ হল। ট্রাইডেন্টের ঘোলা পানি সেদিন রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল। সাত রাজ্যের সহস্র সৈন্যের সম্মিলিত রক্ত। আর সেই রক্তের মাঝে জ্বলজ্বল করছিল এক পতিত রাজপুত্রের লাল রুবিগুলো। যেন বারুদে আগুন লাগার মতই ট্রাইডেন্টের যুদ্ধের খবর পৌঁছে গেল চারিদিকে। উন্মাদ রাজার অনুচর পাইরোম্যান্সাররা রাজধানী জুড়ে ওয়াইল্ডফায়ারের ঘড়া লুকিয়ে রাখতে শুরু করল। নির্দেশ পাওয়া মাত্রই পুরো নগর ভস্মীভূত হবে। খবর চলে গেল ডর্নের রাজপুত্রের কাছে। সে রাজধানীতে লোক পাঠালো রেয়গারের স্ত্রী এলিয়া মার্টেল আর তার সন্তানদের ডর্নে আনিয়ে নেয়ার জন্য। এয়রিস তাদের ছাড়ল না, প্রকারান্তরে বন্দীই করে রাখল রেড কিপের ভেতর। এদের পাশাপাশি এয়রিস জেইমিকেও একরকম আটকে রেখেছিল। ট্রাইডেন্টে যখন কিংসগার্ডের স্যার সেলমি, ড্যারি আর লিউইন যাচ্ছিল তখন জেইমিও সঙ্গে যাওয়ার অনুরোধ করেছিল। কিন্তু এয়রিস তাকে রেড কিপে নিজস্ব পাহারায় রেখে দিল। রবার্টের জয়ের খবর গিয়েছিল পশ্চিমেও, লর্ড টাইউইন ল্যানিস্টারের কাছে। এতদিন যুদ্ধের নীরব দর্শক সিংহ এবারে গা ঝাড়া দিয়ে উঠল। ওয়েস্টারল্যান্ডের ব্যানারম্যানদের জড়ো করে রওনা দেয়ার আগেই জানতে পারল আয়রন আইল্যান্ডের লর্ড কোয়েলন গ্রেজয় অরক্ষিত রিচ রাজ্যের উত্তর বন্দরে আক্রমণ করেছে। এতদিনের যুদ্ধে তারাও নিরপেক্ষ দর্শকের ভূমিকায় ছিল। রবার্টের জয়ের খবরে তারা বিদ্রোহে যোগ দিয়েছে। ওদিকে রিচ রাজ্যের লর্ড মেইস টাইরেল তখনও স্টর্মস এন্ড ঘেরাও করে বসে আছে!

ট্রাইডেন্টের যুদ্ধের শেষে বিদ্রোহীদের জন্য কিংস ল্যান্ডিংয়ের পথ সুগম হয়ে গেল। যদিও রবার্টের পক্ষে নড়াচড়া করাও অসম্ভব ছিল। রেয়গার লড়াইয়ে হারার আগে রবার্টকে ভালভাবেই জখম করে দিয়েছে। তাই রবার্টের হয়ে নেড এবার নেতৃত্ব কাঁধে তুলে নিল, ঠিক যেভাবে সে নিজের হাউজ আর নর্থের দায়িত্ব নিয়েছে। কিংসরোড ধরে দক্ষিণপানে রাজধানী লক্ষ্য। কিন্তু অল্প কয়েকঘণ্টার ব্যবধানে সেখানে আগে পৌঁছে গেল টাইউইন ল্যানিস্টার। প্রধান ফটক বন্ধ। ফটকের দেয়ালে প্রচুর রক্ষী ও সৈন্য। এয়রিস যথেষ্টই আতঙ্কিত হয়ে আছে। টাইউইন তাই বাইরে থেকেই খবর পাঠালো রাজার কাছে, রেয়গারের দুঃখজনক মৃত্যুর খবর শুনে আমি আর দূরে থাকতে পারলাম না। আমাদের মাঝে অনেক ঘটনা ঘটেছে, কিন্তু সবকিছুর পরেও আমি আপনার বন্ধু। আমি সৈন্যসামন্ত নিয়ে এসেছি, রাজধানী রক্ষা করব। বিদ্রোহীরা এলে আমিই আপনার হয়ে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব। দয়া করে ফটক খুলে দিন। রাজদরবারে বসা এয়রিসের তবু সন্দেহ যায় না। পাশ থেকে গ্র্যান্ডমেয়স্টার পাইসেল ফিসফিস করে বলে, “লর্ড টাইউইন আপনার বিশ্বস্ত ও অনুগত সেবক। বহুবছর ধরে সে আপনার আর সাম্রাজ্যের সেবা করেছে। এবারও করবে। আপনি তাকে অনুমতি দিন।” এয়রিস অন্যপাশে তাকায়, কেশহীন মাকড়সা ভ্যারিস নিঃশব্দে সম্মতি প্রদর্শনে মাথা নোয়ায়। “ঠিক আছে। খুলে দাও ফটক। দরবারে আসতে বলো আমার বন্ধু টাইউইনকে।”

তারপর স্মরণকালের ভয়াবহতম গণহত্যার উৎসব শুরু হয়ে কিংস ল্যান্ডিংয়ে। ল্যানিস্টার সৈন্যরা নগরের পথে পথে টারগারিয়েনদের রক্ষী, সৈন্য, সম্ভ্রান্ত – যাকেই সামনে পায় তাকেই খুন করতে শুরু করে। রক্তে ভেসে যেতে থাকে রাজধানীর পথঘাট। টাইউইন তার সাথে অল্প কিছু সৈন্য নিয়ে সেই পথেই ঘোড়া ছোটায় রেড কিপের উদ্দেশ্যে। এতদিনের বন্ধুর সাথে ‘দেখা’ করতে হবে না! টাইউইনের বাহিনীর একদম সামনের দিকে ছিল স্যার গ্রেগর ক্লেগেইন আর স্যার অ্যামোরি লর্চ। অন্যরা যখন সামনের ফটক দিয়ে ঢুকে নগর তছনছ করতে করতে রেড কিপ প্রাসাদের দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিল, তখন তারা দুইজন প্রাসাদের ভেতরে মেয়গরের দুর্গে ঢুকে পড়েছিল। এয়রিস এখানে রেয়গারের স্ত্রী এলিয়া মার্টেলকে গৃহবন্দী করে রেখেছিল। এই দুর্গের শয্যাকক্ষে এলিয়ার সাথে তার তিন বছরের কন্যা রেয়নিস আর দুধের বাচ্চা এয়গন লুকিয়ে ছিল। স্যার অ্যামোরি লর্চ রেয়গারের বিছানার নিচ থেকে রেয়নিসকে টেনে হিঁচড়ে বের করল। দুর্গের করিডোর দিয়ে টানতে টানতে নিয়ে তাকে ছুরি দিয়ে কুপিয়ে কুপিয়ে হত্যা করল। আর স্যার গ্রেগর এলিয়ার ঘরে ঢুকে এয়গনকে দেয়ালের সাথে পিষে মেরে ফেলল এলিয়ার সামনেই, আর চিৎকার করতে থাকা এলিয়াকে ধরে ধর্ষণের পর হত্যা করল। গ্রেগর আর অ্যামোরির এই নিষ্ঠুরতায় শিউরে উঠেছিল খোদ ল্যানিস্টারের সৈন্যরাই।

এলিয়া আর শিশু এয়গনকে হত্যা করছে গ্রেগর ক্লেগেইন

এদিকে রেড কিপের সুউচ্চ মিনার থেকে অলিগলির মানুষের সম্মিলিত চিৎকার শোনা যায়। এয়রিস দ্রুত তার দরবারকক্ষে ফিরে পাইরোম্যান্সারকে নির্দেশ দেয়, “BURN THEM! BURN THEM ALL!” পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল একমাত্র কিংসগার্ড জেইমি। তার দিকে তাকিয়ে এয়রিস রক্তচক্ষে আবার চিৎকার করে, “বেজন্মার বাচ্চা! টাইউইনের মাথা কেটে আমার সামনে হাজির কর!” হতচকিত জেইমি দেখে কক্ষ থেকে দ্রুত বেরিয়ে যাচ্ছে রাজার হ্যান্ড রজার্ট। এত মানুষ থাকতে এই পাইরোম্যান্সার উইজার্ট রজার্টকে এয়রিস হ্যান্ডের দায়িত্ব দিয়েছিল। এই রজার্টই পুরো নগরীকে বিস্ফোরন্মুখ আগ্নেয়গিরি বানিয়ে রেখেছে। রাজার নির্দেশে তার মুখে ক্রূর হাসি, চোখ চকচক করছে আসন্ন ধ্বংসযজ্ঞের আশায়। এই কক্ষের বাইরে গেলেই সে নির্দেশ ছড়িয়ে পড়বে আর সে দাবানলে পুড়ে ছাই হয়ে যাবে সবাই, খুনে অপরাধী থেকে নিষ্পাপ শিশুটিও। জেইমি রাজাকে নিবৃত করার শেষ চেষ্টা করে, “একবার ভেবে দেখুন। আমি আপনাকে রক্ষা করব। দয়া করে রজার্টকে থামতে বলেন। সব জ্বলে পুড়ে শেষ হয়ে যাবে।” রাজা এয়রিস ঝট করে তার দিকে তাকালো, “প্রতারকের বাচ্চা! তুই আমাকে উপদেশ শোনাচ্ছিস! তোর যা কাজ সেটা কর! যা বলছি সেটা কর!” জেইমি এবার চোয়াল শক্ত করে রজার্টের দিকে তাকায়। মুহূর্তেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে কী করতে হবে। খাপ থেকে তলোয়ার বের করে সোজা চালিয়ে দেয় রজার্টের বুক বরাবর। সিংহাসন থেকে চিৎকার করে উঠে দাঁড়ায় রাজা এয়রিস। এবারে জেইমি তার দিকে তেড়ে আসে। সিংহাসনের পেছনে লুকানোর চেষ্টা করছিল এয়রিস, এবার তাকেও একই তলোয়ারে হত্যা করে জেইমি। যে বন্ধু টাইউইনকে সে এতদিন ধরে সন্দেহ করে আসছে, সেই টাইউইনের ছেলেই হলো শেষ পর্যন্ত তার মৃত্যুর কারণ।

পুরো রাজধানী জুড়ে এই তাণ্ডবের মধ্যেই এসে হাজির হলো নেড এবং তার বাহিনী। পুরো শহর তখন বিধ্বস্ত, কান্না আর আহাজারিতে বাতাস ভারী হয়ে আছে। এক অজানা আশঙ্কায় নেড দ্রুত প্রাসাদের ভেতরে ছুটে আসল। রাজদরবারের বন্ধ দরজা ধাক্কা দিয়ে খুলেই দেখতে পেল রজার্টের রক্তমাখা লাশ পড়ে আছে। আর দরবারের একদম শেষ মাথায় আয়রন থ্রোনের ওপর সোনালি বর্ম পরে জেইমি ল্যানিস্টার খোলা তলোয়ার হাতে বসে আছে। সিংহাসনের পেছনে মৃত এয়রিসের শরীরের অর্ধেকটা দেখা যাচ্ছে। কিংস্লেয়ার! খুনী! রাজাকে রক্ষা করার আজীবন প্রতিজ্ঞা করে সেই কিনা রাজাকে খুন করেছে!! চোয়াল শক্ত হয়ে গেল নেডের। এরই মধ্যে ছুটতে ছুটতে এসে এক সৈন্য তাকে মেয়গরের দুর্গে রাজকন্যা আর রাজপুত্রদের মৃত লাশের খবর দিল। পুরো শহরের এই নারকীয় অবস্থায় নেড শান্তিপ্রতিষ্ঠার দায়িত্ব নিল। বিদ্রোহী বাহিনীকে দিয়ে ল্যানিস্টারদের নিরস্ত করালো। রবার্টের আসা পর্যন্ত আর কোনপ্রকার হত্যা বা আক্রমণ যেন না হয় সেটা নিশ্চিত করল।

কিংস ল্যান্ডিংয়ে ল্যানিস্টারদের গণহত্যা

রবার্ট কিংস ল্যান্ডিংয়ে প্রবেশ করলো রাজার বেশে। সমস্ত রাজধানী জুড়ে সাজ সাজ রব, নতুন রাজাকে অভিষেকের আগেই সাদরে বরণ করে নিতে প্রস্তুত। আয়রন থ্রোনে বসলো রবার্ট ব্যারাথিয়ন। লর্ড টাইউইন ল্যানিস্টার তার আনুগত্যের নিদর্শন স্বরূপ শিশু এয়গন আর রেয়নিসের রক্তমাখা লাশ দুটো গাঢ় লাল ল্যানিস্টার কাপড়ে মুড়ে তার পায়ের কাছে রাখল। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা নিশ্চুপ নেডের মুখে চাপা ক্রোধের ছায়া। এমনকি রবার্ট, যে কিনা সকল টারগারিয়েনের বিনাশ চেয়েছিল, সেও এই লাশগুলোর দিকে ফিরে তাকাতে পারছিল না। লাল কাপড়েও কালচে হয়ে যাওয়া রক্তের দাগ ঢাকা পড়ছে না। শিশুটির মুখের জায়গায় প্রায় কিছু নেই, শুকিয়ে খটখটে হওয়া খুলির অংশবিশেষ ছাড়া। এয়রিস আর টাইউইনের সম্পর্কের অবনতি হয়েছিল ধীরে ধীরে। বোঝাই যায় না এমনভাবে। অনেকদিন পার হলে দুপক্ষই টের পেয়েছে যে কেউ কাউকে আর বিশ্বাস করতে পারছে না। বাকিরাও তখন সেই দূরত্বের আভাস ধরতে পেরেছিল। কিন্তু নেড আর রবার্টের কৈশোরিক বন্ধুত্বের প্রথম ফাটল এই দিন দেখা দিল। বিস্মিত নেডের সামনেই রবার্ট জেইমি আর টাইউইনকে নিঃশর্তভাবে ক্ষমা করে দিল। শুধু তাই না, কিংস্লেয়ার জেইমিকে শাস্তির বদলে কিংসগার্ড হিসেবেই বহাল রাখল। দুটো নিষ্পাপ শিশুকে হত্যা করেও খুনীরা রেহাই পেয়ে গেল। এমনকি রবার্ট এটাও বলেছিল যে, ভালই হয়েছে, ড্রাগনদের চারা বেড়ে ওঠার আগেই উপড়ে ফেলা হয়েছে।

রাগে ক্ষোভে ফেটে পড়ার আগেই নেড রাজধানী থেকে চলে গেল। রেয়গার আর এয়রিস মারা গেছে, মারা গেছে রেয়গারের সন্তানেরাও। কিন্তু তার ব্যক্তিগত যুদ্ধ এখনো শেষ হয়নি। লিয়ানা এখনো নিখোঁজ, অথচ রবার্টকে দেখে মনে হচ্ছে সিংহাসন পেয়ে ল্যানিস্টারদের অপরাধের পাশাপাশি লিয়ানাকেও সে ভুলে গিয়েছে। একদম বিশ্বস্ত একটা বাহিনী নিয়ে নেড তাই দক্ষিণে স্টর্মল্যান্ডের দিকে রওনা দিল। তার সাথে উইন্টারফেলের ব্যানারম্যানরা, নর্থের বিভিন্ন হাউজের লর্ড আর নাইটরা, আর অল্পদিনেই ভাল বন্ধু হয়ে ওঠা ক্র্যানোগম্যান হাওল্যান্ড রিড। স্টর্মস এন্ড প্রাসাদের বাইরে তখনও মেইস টাইরেল ঘেরাও করে বসে আছে। ভেতরে স্ট্যানিস ব্যারাথিয়ন আটকে পড়াদের খাদ্যের জোগান দিতে হিমশিম খাচ্ছিল। তাকে লুকিয়ে লুকিয়ে পেঁয়াজ সরবরাহ করছিল ড্যাভোস নামের এক মামুলি চোর। নেডের বাহিনী গিয়ে পৌঁছানো মাত্রই মেইস রবার্টের বশ্যতা স্বীকার করে নিল। মনে হলো কেউ না এলে সম্মান ধরে রাখতে তাদেরকে এখানেই আরো অনেকদিন থাকতে হতো। নিজের হাউজের মুখরক্ষা পেয়েছে ভেবে মেইস টাইরেল হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। বছরখানেক এই মরার স্টর্মল্যান্ডে বসে থাকাও কম কষ্টের না! কিন্তু নেডের উদ্বিগ্নতা ক্রমেই বাড়ছে। কোথায় লিয়ানা? রেয়গার তাকে কোথায় লুকিয়ে রেখেছে? মেরে ফেলেনি তো? রেয়গারকে যতটা চিনেছে, তাতে তার এমন করার কথা না। এরইমাঝে নেডের কাছে খবর আসে, রিভাররানে কেইটলিন এক ফুটফুটে ছেলের জন্ম দিয়েছে। মনে মনে নেড ভাবে ছেলের কী নাম রাখা যায়? রবার্ট রাখবে ভেবেছিল, কিন্তু নামটা ভাবতেই মুখে থুতু জমে উঠল তার। না, ছেলের নাম রাখবে রব। রব অফ হাউজ স্টার্ক! স্টার্ক বংশের বড় ছেলে। বড় ছেলেদের ওপর অনেক দায়িত্ব, আর অনেক বিপদও বটে। ব্র্যান্ডনের কথা মনে পড়ে তার। হায় সেই উচ্ছ্বল উদ্দাম বেপরোয়া ভাইটা আমার! স্টর্মস এন্ড থেকে স্ট্যানিসকে মুক্ত করে এবার নেড আরো দক্ষিণের দিকে মুখ ফেরায়। রেয়গারের শেষ ঘাঁটি ডর্নের টাওয়ার অফ জয়। সেখানেই লিয়ানাকে পাওয়ার শেষ ভরসা। এবার আরো দ্রুত যেতে চায় সে, কারণ যতই সময় যাচ্ছে লিয়ানাকে খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা ততই কমে আসছে।

নেডের স্বপ্ন ভাঙে দুঃস্বপ্নের মতো। লিয়ানার প্রতিজ্ঞা সেদিনের পর থেকে এক মুহূর্তের জন্যেও সে ভুলতে পারে নি। সেদিন টাওয়ার অফ জয়ের নিচে পড়ে ছিল তিন কিংসগার্ডের মৃতদেহ, সাথে তার ছয় সাথীর পাঁচ জনের নিথর নিষ্প্রাণ দেহও। একমাত্র হাওল্যান্ড রিড ছিল তার পাশে। টাওয়ার থেকে রক্তমাখা হাতে ধবধবে কাপড়ে মোড়ানো এক সদ্যোজাত শিশুকে নিয়ে নেমে এসেছিল নেড। শিশুটির মাথায় লিয়ানার মতই কুচকুচে কালো চুল, চোখের রঙ কালচে খয়েরি, অনেকটা কালোর কাছাকাছি। যুদ্ধের পরে নেড এই টাওয়ারটা একদিন ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছিল। আর তার সামনের এই রণক্ষেত্রে আটজন পতিত যোদ্ধার জন্যে স্মৃতিফলক বানিয়েছিল। স্যার আর্থার ডেইনের তলোয়ার নিয়ে পৌঁছে দিয়েছিল তার বাড়ি স্টারফলে। বিষণ্ণ থমথমে চেহারায় মুখোমুখি হয়েছিল আশারা ডেইনের। হ্যারেনহাল টুর্নামেন্টের আগের রাতের ভোজে দেখা সেই ঝলমলে তরুণীকে দেখে তার মনে হয়েছিল কেউ যেন তার হৃদয় থেকে সমস্ত প্রাণ শুষে নিয়ে গেছে। আর্থারের মৃত্যুর খবর শুনে আর ড’ন তলোয়ার দেখে তার মুখ কাগজের মতো সাদা হয়ে গিয়েছিল। নেড সেখানেও বেশিক্ষণ অপেক্ষা করেনি। নয়ত জানতে পারত সে চলে যাওয়ার একদিন পরই স্টারফলের উঁচু মিনার থেকে লাফিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করেছে আশারা।

Promise me, Ned!

রিভাররান থেকে ততদিনে কেইটলিন চলে গিয়েছে উইন্টারফেলে। সেখানে নেডের ছোটভাই বেনজেন তার দেখাশোনা করছে। বাবা রিকার্ড, ভাই ব্র্যান্ডন, আর বোন লিয়ানার মৃতদেহ নিয়ে উইন্টারফেলে পৌঁছালো নেড, সাথে এক অজানা শিশু। প্রায় দেড় বছর পর কেইটলিনের সাথে দেখা হলো তার। কেইটলিনের কোলে তার নিজের সন্তান, রব। এদের সামনে দাঁড়িয়ে কোলের শিশুটিকে নিয়ে দ্বিধায় পোড়ে নেড। কী বলবে কেইটলিনকে? এই শিশু কার? এখন না হোক, পরে কোন একদিন হয়তো সত্যি বলতে পারবে সে। কিন্তু এখন তাকে মিথ্যা বলতে হবে। সত্যবাদী বলে বিখ্যাত নেড স্টার্ক, যে কখনো অসম্মানের কোন কাজ করে না, যার আদর্শ সদাউন্নত, সেই নেড নির্বিকার মুখে মিথ্যা বলল। এই শিশুর পিতা সে, কিন্তু মায়ের পরিচয় সে বলল না। কেইটলিনের থমকে যাওয়া মুখ আর শক্ত হয়ে যাওয়া চোয়ালের ভঙ্গি দেখে নেড বুঝল আজ এই দূরত্বকে সে হয়তো কখনই পার হতে পারবে না। খবর পেল রবার্ট এর মধ্যে জন অ্যারিনকে তার হ্যান্ড বানিয়েছে। অন্তত টাইউইনকে যে বানায়নি, সেটা ভেবে কিছুটা স্বস্তি পেল। রবার্টের জন্য হ্যান্ড হিসেবে জন অ্যারিনই জরুরি। এই অজ্ঞাতশিশুর নামও তার নামেই রেখেছে – জন স্নো। ডর্নের পাথুরে লাল পাহাড়ি মাটিতে জন্মালেও সে নেডের জারজ, উত্তরের তুষারই তার নামের অংশ হবে। মাঝে মাঝে বিনিদ্র বিস্রস্ত রাতে নেড এই সময় নিয়ে ভাবতেই থাকে। ভেবে কোন কূলকিনারা পায় না। এই যুদ্ধ করে কে আসলে জিতলো? কে হারলো? রবার্ট সাম্রাজ্য চেয়েছিল, লিয়ানাকেও চেয়েছিল। সাম্রাজ্য পেলেও তার রাণী হয়েছে আরেক ল্যানিস্টার। লিয়ানা বোধহয় শুধু তার ভালোবাসার মানুষগুলোকে নিরাপদে রাখতে চেয়েছিল। রেয়গারকে বাঁচাতে পারে নি, কিন্তু নিজের জীবন দিয়েও তাদের সন্তানকে বাঁচিয়েছে। নেড আরও ভাবে সে আসলে কী চেয়েছিল? লিয়ানাকে উদ্ধার করতে? রবার্টকে রাজ্য পাইয়ে দিতে? বাবা আর ভাইয়ের হত্যার প্রতিশোধ নিতে? কোনটাই কি সে পেরেছে? এমন রাতগুলোতে স্যার আর্থার ডেইনের সেই অমোঘ উচ্চারণ ফিরে ফিরে আসে তার কাছে, “আর এখন এই যুদ্ধ শুরু হল!” এ যুদ্ধের বুঝি আর কোন শেষ নেই!

*তথ্যসূত্র: A World of Ice and Fire, A Song of Ice and Fire book series.

প্রথম পর্ব-  এয়রিস ও টাইউইন: মুখোশবন্ধুদের গল্প

দ্বিতীয় পর্ব – রেয়গার ও লিয়ানা : ভ্রান্তিবসন্ত, নীল গোলাপ আর নেকড়েমানবীর গল্প

Anik Andalib

Teacher by profession. Writer by passion. Loves to read and write about science, literature, films, and TV shows.

FOLLOW US ON

ICE Today, a premier English lifestyle magazine, is devoted to being the best in terms of information,communication, and entertainment (ICE).