গেম অফ থ্রোনস: ৭.০৪: রিভিউ

গেম অফ থ্রোনসের ৭ম সিজনের ৪র্থ পর্বের নাম ছিল “স্পয়েলস অফ ওয়ার”। বোঝাই যাচ্ছিল একটি বড় অংশ থাকবে যুদ্ধ আর যুদ্ধের ঘটনা নিয়ে। আগের এপিসোডের একদম শেষে ল্যানিস্টারদের প্রাসাদ ক্যাস্টারলি রকে হামলা করে দখল করে নেয় ডেনেরিস টারগারিয়েনের আনসা’লিড বাহিনী। কিন্তু তারা যখন প্রাসাদ দখলে ব্যস্ত তখন তাদের জাহাজগুলোতে অতর্কিত হামলা করে বসে ইউরন গ্রেজয়ের নৌবাহিনী। সুতরাং বেশিক্ষণ এই দখল ধরে রাখতে পারবে না ডেনেরিস। অন্যদিকে জেইমি গিয়ে হাজির হয়েছে হাইগার্ডেন তথা টাইরেলদের প্রাসাদে। সেখানেও অতর্কিত হামলায় কুইন অফ থর্ন ওলেনা টাইরেলকে পরাস্ত করেছে সে, বেশ শান্তভাবেই তাকে বিষ দিয়েছে। মারা যাওয়ার আগে অবশ্য ওলেনা শেষ দাঁওটা মেরে দিয়েছেন, জেইমি আর সার্সেইয়ের ছেলে রাজা জফ্রিকে মারার মূল পরিকল্পনাকারী যে তিনি  ছিল সেটা স্বীকার করে।

রোজ রোড

ল্যানিস্টারদের যাত্রাপথ
ল্যানিস্টারদের যাত্রাপথ

তাই এই পর্ব শুরুও হলো সেখান থেকেই। হাইগার্ডেনের শস্যাগার আর কোষাগার লুটে কিংস ল্যান্ডিংয়ের পথে রওনা হয়েছে জেইমি ও তার ল্যানিস্টার বাহিনী। হাইগার্ডেন থেকে কিংস ল্যান্ডিং পর্যন্ত মূল রাস্তাটার নাম রোজ রোড। এখানে ব্রনের সাথে জেইমির কথোপকথন দিয়েই পর্ব শুরু হলো। একটু আগে ওলেনার স্বীকারোক্তি জেইমির প্রাসাদ জয়ের আনন্দে পানি ঢেলে দিয়েছে। ব্রনকে প্রাপ্ত সোনাদানার একটা থলে দিলেও সে আরো বেশি পুরষ্কারের কথা মনে করিয়ে দিতে থাকে। এসময় লর্ড র‍্যান্ডিল টার্লি এসে জানায় যে মোটামুটি সব লুটেপুটে শেষ, শুধু মাঠে যে ফসল রয়েছে সেটাই সংগ্রহ করা বাকি। শীত এসে যাচ্ছে, তার আগে শেষ ফসল এখনও মাঠ থেকে তোলা হয়নি। সেটা তুলতে কৃষকদের দ্রুত তাগাদা দিতে বললো জেইমি। তাদের যাত্রাপথটাও দীর্ঘ (নিচের ছবি দ্রষ্টব্য) এবং এই পথে মোটামুটি অরক্ষিতভাবেই এতকিছু নিয়ে যেতে হবে। তাই যত তাড়াতাড়ি যাওয়া সম্ভব ততই মঙ্গল।

কিংস ল্যান্ডিং

এর পরেই কিংস ল্যান্ডিংয়ের একমাত্র দৃশ্যটি রাণী সার্সেই আর আয়রন ব্যাঙ্কের প্রতিনিধি টাইকো নেস্টোরিসের মধ্যে। জেইমি যে হাইগার্ডেন থেকে প্রচুর সোনাদানা আর শস্য পেয়েছে সে খবর রাজধানীতে পৌঁছে গেছে। আয়রন ব্যাঙ্কের কাছে রাজকোষের ঋণ প্রচুর। প্রতি মাসে তাদেরকে বড় অঙ্কের সুদ দিতে হতো, মূল ঋণ তো চুকানোর প্রশ্নই আসে না। হাইগার্ডেন দখল করতে পারায় এখন এক ধাক্কায় সুদসহ পুরো ঋণ শোধ করে দিতে পারছে। সার্সেইয়ের চেহারার আত্মতৃপ্তিই বলে তার কাঁধ থেকে এক বিশাল বোঝা নেমে গেছে। টাইকো তার স্বভাবসুলভ হাসিমুখ ঝুলিয়ে রাখলেও বোঝা যাচ্ছিল যে এত দ্রুত ঋণ মিটে গেল দেখে সে বেশ হতাশ হয়েছে। আয়রন ব্যাঙ্ক এখন আর নিজেদের খবরদারি আগের মতো খাটাতে পারবে না। এই কথোপকথনে একটা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানা গেল। সার্সেইয়ের হ্যান্ড কাইবার্ন এসোসের গোল্ডেন কোম্পানির সাথে যোগাযোগ করেছে। তার কোন একটা জিনিস ফিরিয়ে আনতে তাদের সাহায্য নিচ্ছে। কী জিনিস সেটা পরিষ্কার হলো না।

Cersei: “My Hand, Qyburn, has made overtures to the Golden Company in Essos.”

Tycho: “I know them well. They have helped us recover significant sums from parties who had fallen into deep arrears.”

এয়গর "বিটারস্টিল" টারগারিয়েন ও তার গোল্ডেন কোম্পানি
এয়গর “বিটারস্টিল” টারগারিয়েন ও তার গোল্ডেন কোম্পানি

গোল্ডেন কোম্পানি মূলত ভাড়াটে যোদ্ধাদের বাহিনী। প্রায় একশ বছর আগে ৪র্থ এয়গন টারগারিয়েন রাজার জারজ ছেলে এয়গর টারগারিয়েনের হাতে এই বাহিনী গড়ে ওঠে। সেসময় এয়গনের মৃত্যুর পর সিংহাসনের দাবি নিয়ে তুলকালাম যুদ্ধ শুরু হয়েছিল। তার নিজের বৈধ ছেলে সিংহাসনে বসলেও মারা যাওয়ার আগে সে তার জারজ ছেলেদের বৈধতা দিয়ে যায়। এদেরই একজন এয়গর এই গোল্ডেন কোম্পানির গোড়াপত্তন করে। একশ বছর পরেও এই কোম্পানি যথেষ্টই প্রভাবশালী, কারণ তারা কখনই কোন কাজ নিলে সেটা না করে ছাড়ে না। আয়রন ব্যাঙ্কও তাদের বিভিন্ন ঋণখেলাপিদের কাছ থেকে টাকা আদায়ের জন্য এই কোম্পানির সাহায্য নিয়ে থাকে।

উইন্টারফেল

এই পর্বের অনেকগুলো দৃশ্য উইন্টারফেল ঘিরে। প্রথমেই দেখা গেল লিটলফিঙ্গার ব্র্যানকে একটা ভ্যালিরিয়ান স্টিলের বানানো ছোরা এগিয়ে দিচ্ছে। এই সেই কুখ্যাত ছোরা, যেটা দিয়ে পঙ্গু ও অচেতন ব্র্যানকে রাতের আঁধারে খুন করতে এসেছিল এক ভাড়াটে খুনী। ব্র্যানের পাশে সেদিন তার মা কেইটলিন স্টার্ক ছিলেন, তার সাহসিকতায় খুনীটা সুযোগ পায়নি। ব্র্যানের পাশেই শুয়ে থাকা সামার সেই খুনীর গলা টেনে ছিঁড়ে খেয়ে ফেলেছিল। মূলত এই ঘটনার পরেই কেইটলিনের মনে বদ্ধমূল ধারণা হয় যে নেড ও তার মেয়েরা বিপদে পড়তে যাচ্ছে। তারা তখন কিংস ল্যান্ডিংয়ের পথে রওনা দিয়েছে রাজা রবার্ট ও তার দলবলের সাথে। কেইটলিন তাই তড়িঘড়ি করে কিংস ল্যান্ডিংয়ে গিয়ে হাজির হয়। সেখানে লিটলফিঙ্গারই তাকে বলেছিল এই ছোরার মালিক টিরিয়ন ল্যানিস্টার। কিংস ল্যান্ডিং থেকে ফেরার পথে কেইটলিন টিরিয়নকে বন্দী করে ঈরিতে নিয়ে যায়। আর তারপরেই একের পর এক ঘটনার ফলাফলে পাঁচ রাজার যুদ্ধ। বলা যায় এই ছোরাকে দিয়েই সব ঘটনার সূত্রপাত, আর এর পেছনে লিটলফিঙ্গারের অবদানও কম না। লিটলফিঙ্গার সেসময় কেইটলিনকে ইচ্ছা করেই টিরিয়নের নাম বলেছিল, যেন স্টার্কদের সাথে ল্যানিস্টারদের লড়াই বাঁধিয়ে দেয়া যায়। এখন ব্র্যানের সামনে সেটা বেমালুম চেপে গেল। আমরা এও জানি যে রবার্টের রাজত্বকে অস্থিতিশীল করার নীল নকশা লিটলফিঙ্গার তারও অনেক আগে থেকে শুরু করেছিল। রবার্টের হ্যান্ড লর্ড জন অ্যারিন বিষক্রিয়ায় মারা যান। সেই বিষ তাকে খাইয়েছিল তারই স্ত্রী লিসা টালি, লিটলফিঙ্গারের প্ররোচনায়। অ্যারিন মারা যাওয়ার পর রবার্ট উইন্টারফেলে এসে নেডকে হ্যান্ড হবার আদেশ দেয়। লিটলফিঙ্গার জানে না যে দর্শকদের মতই ত্রিকালদর্শী কাকভুষুণ্ডি ব্র্যান্ডন স্টার্কও অতীতের সব ঘটনাই দেখতে পাচ্ছে। উপরে উপরে ব্র্যানকে যতটা নিরীহ মনে হচ্ছে, ততটা সে নয়। লিটলফিঙ্গার তার স্বভাবসুলভ মিষ্টি মিষ্টি কথায় ব্র্যানকে ভোলাতে গেলে ব্র্যান এক বাক্যেই তাকে বুঝিয়ে দিল তার জানার পরিধি কতটুকু।

“Chaos is a ladder.” – Bran

ঠিক এই বাক্যটা লিটলফিঙ্গার ভ্যারিসের সাথে এক কথোপকথনে বলেছিল। কয়েক বছর আগে সেই আলাপের সময় কিংস ল্যান্ডিংয়ের থ্রোন রুমে সে আর ভ্যারিস ছাড়া কেউই ছিল না। ব্র্যানের জানার কোন প্রশ্নই আসে না। এই এক ইশারায় লিটলফিঙ্গার ব্র্যানের ক্ষমতার একটা ছোট্ট নমুনা দেখতে পেল।

এখানে একটা কথা না বললেই না, ব্র্যানের চরিত্রে আইজ্যাক হেম্পস্টিড রাইট রীতিমত দুর্দান্ত অভিনয় করছে। উপন্যাসগুলোতে ব্র্যানের চরিত্রের যে পরিবর্তন তা পুরোপুরি বর্ণনা করা হয়েছে। তার বারবার ওয়ার্গ করে ডায়ারউলফ ‘সামার’-এর ভেতরে ঢুকে যাওয়া, কিংবা ওয়্যারউড ট্রি স্পর্শ করে সেই গাছের স্মৃতিতে অতীত ভ্রমণ করার ব্যাপারগুলো জাদুময় এবং রহস্যময়। শুধু তাই না, ব্র্যান প্রায়ই স্বপ্ন দেখে, যেগুলো মূলত অতীত বা ভবিষ্যতের ঘটনা। কিন্তু তার কাছে এগুলোও রহস্যময় কারণ স্বপ্নগুলো আবছা আবছা, স্বপ্নে দেখা মানুষগুলোকেও সে আগে কখনো দেখে নি। কোন কোন স্বপ্ন পুরোপুরি রূপকার্থে ধরা দেয়। এগুলো পড়লে আমরা তবু কিছুটা আন্দাজ করতে পারি, কিন্তু টিভি শো’তে এগুলো ফুটিয়ে তোলা কঠিন। এতটা অন্তর্নিহিত পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে যাওয়ার পরেও তার আচরণ যেমন হওয়ার কথা তেমনই হচ্ছে। লিটলফিঙ্গার বা মিরার সাথে নির্বিকার ও শীতল আচরণ করার পেছনেও যথেষ্ট কারণ আছে। এই মুহূর্তে ব্র্যানের নিজস্ব স্বত্ত্বাকে থ্রি-আইড-রেইভেনের স্বত্ত্বা পুরোপুরি দখল করে নিয়েছে। অনেকটা যেন কোন অশরীরী প্রেত কোন মানুষের মগজে ভর করেছে, যে প্রেতের প্রভাবে তার নিজস্বতা পুরোপুরি চাপা পড়ে গেছে। মিরার কথাটাই সত্যি আসলে, “You died in that cave.” আগের সেই নিরীহ কিশোর ব্র্যানকে হয়তো আর কখনই দেখা যাবে না। এমন নীরব বিদায় আসলেই কষ্টকর। একেবারেই অল্প সংলাপে এরকম একটা জটিল বিষয় ফুটিয়ে তুলেছে আইজ্যাক।

“But our stories aren’t over yet.” – Arya

উইন্টারফেলের এর পরের দৃশ্যটি আরিয়ার – এত বছর পর অবশেষে আরিয়া আবার উইন্টারফেলে ফিরে এসেছে। দুই প্রহরীর মাঝে কে গিয়ে সানসাকে এই অদ্ভুত মেয়েটির কথা বলবে, তার মাঝে আমরা আরিয়ার চোখে উইন্টারফেলের চারপাশটাকে এক নজর দেখলাম। সবকিছুই নিজস্ব নিয়মে চলছে, আরিয়ার জ্ঞান হবার পর থেকে জেনে আসা ঘর তার অনুপস্থিতিতে অনেক বদলে গেলেও মানুষগুলো আগের নিয়মেই নিজেদের কাজ করে চলেছে। এখানে বরং এই পরিবর্তিত আরিয়াই নতুন। আরিয়া হয়তো তাই নিজের পরিচিতদের খোঁজে পারিবারিক কবরস্থানে চলে গেল। নেড স্টার্ককে যেখানে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়েছে সেটার ওপরে তার একটি পাথরের ভাস্কর্য, হাতে তার তলোয়ার ‘আইস’-এর প্রতিলিপি। নেডের ছেলে-মেয়ের মধ্যে একমাত্র আরিয়া আর সানসাই তার শেষ মুহূর্তের সাক্ষী ছিল। আজ তারা দু’জনেই চড়াই উৎরাই পেরিয়ে তার কবরের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। দুজনেই আমূল বদলে গেছে, পরিণত হয়েছে, ভেঙেছে, ফের গড়েছে নিজেদের। আরিয়া আর সানসার আলিঙ্গনে তাই মনে হলো দুইজন সম্পূর্ণ অপরিচিত মানুষ একে অপরকে জড়িয়ে ধরছে। আরিয়ার ইতস্তত ভাবটাই বেশি ছিল। বহুদিন ধরে একা একা লড়াই করতে করতে নিজেকে আড়াল করে রাখার অভ্যাস হয়ে গেছে তার। কিছুক্ষণ কথা বলার পরে দ্বিতীয় আলিঙ্গনে আবারও পুরনো আরিয়াকে কিছুটা ফিরে পাওয়া গেল।

সানসার পরে ব্র্যানের সাথে আরিয়ার দেখার হবার পালা। একসাথে তিন তিনজন স্টার্ক শেষ কবে এক ফ্রেমে ছিল তা ভাবতে বসলে প্রথম সিজনের পরে কিছু খুঁজে পাওয়া দুস্কর। তাদের দৃশ্যটাও খুবই উপযোগী জায়গায় – গডসউডে লাল শাদা ওয়্যারউডের নিচে। ব্র্যানের সাথে কথা বলে সানসা যেমন থতমত খেয়েছিল, আরিয়ারও একই অবস্থা হলো। লিটলফিঙ্গারের দেয়া ছোরাটা ব্র্যান আরিয়াকে দিয়ে দিল। সানসা স্বভাবতই সন্দেহপ্রবণ, তাই লিটলফিঙ্গার কেন ব্র্যানকে ছোরাটা দিয়েছিল সেটা নিয়ে প্রশ্ন করলো। ব্র্যানকে তা নিয়ে খুব একটা ভাবিত মনে হলো না। এই ছোরাটাকে এতবার দেখানো হচ্ছে, তাতে বারবার চেকভের বন্দুকের কথাই মনে পড়ছে। নিশ্চয়ই সামনে এই ছোরার বড় কোন ভূমিকা থাকবে। ব্র্যান সেটা জানে বলেই আরিয়াকে দিয়ে দিল। ত্রিকালজ্ঞ ব্র্যান সম্ভবত সবকিছুই দাবার চালের মতো দেখতে পাচ্ছে। ঠিক কোন ঘটনার কী ফলাফল হতে পারে, বা তার হস্তক্ষেপে কোন কোন ভবিষ্যৎ ঘটার সম্ভাবনা থাকে বা থাকে না – এর সবই সে চিন্তা করে দেখছে। হয়তো এজন্যেই এখনো সানসা বা আরিয়াকে লিটলফিঙ্গারের আসল চরিত্র সে জানায়নি। তাদের বাবার মৃত্যুর পেছনে যে লিটলফিঙ্গারের ভূমিকা ছিল সেটা যদি ব্র্যান বলে দেয় তাহলে উইন্টারফেলেই লিটলফিঙ্গারের ভবলীলা সাঙ্গ হয়ে যাবে।

তিন ভাইবোনে হেঁটে যাওয়ার সময় দূর থেকে ব্রিয়েন আর পড্রিক দেখছিল। অনেক বছর আগে ব্রিয়েন লেডি কেইটলিনের কাছে প্রতিজ্ঞা করেছিল যে তার দুই মেয়েকে রাজধানী থেকে নিরাপদে উইন্টারফেলে পৌঁছে দিবে। ঘটনাচক্রে তার নিজের ওপরও কম ঝড়ঝাপ্টা আসে নি। কিন্তু যেভাবেই হোক সেই দুই মেয়ে আজ উইন্টারফেলের চার দেয়ালের ভেতরে নিরাপদ আছে। পড্রিক তাই সে প্রতিজ্ঞার কথাটাই বললো।

স্টার্ক সন্তানদের মাধ্যমে বারবারই হারিয়ে যাওয়া চরিত্রদের মনে পড়ছিল। নেড আর কেইটলিনের পরে মনে পড়লো আরিয়ার ড্যান্স মাস্টার সিরিও ফোরেলের কথা। আরিয়া আর ব্রিয়েনের মাঝে তলোয়ার খেলায় আরিয়াকে তার গুরুর যোগ্য শিষ্য মনে হচ্ছিল। গুরু মরে গেছে, কিন্তু উপযুক্ত শিষ্যকে রেখে গেছে। আরিয়া যেভাবে হাত পেছনে দিয়ে দাঁড়ায়, বা তলোয়ারের কোপ থেকে বাঁচতে দ্রুত সরে যায়, যেভাবে ঘুরে ঘুরে নিজের অস্ত্র আড়াল করে প্রতিপক্ষের খুব কাছে চলে যায়, তাতে ব্র্যাভোসের লড়াই পদ্ধতি তথা সিরিও ফোরেলের শেখানো পদ্ধতির সাথে অনেক মিল। সমস্যা হচ্ছে তার এই ক্ষমতার কথা সানসা আর লিটলফিঙ্গার জেনে গেছে। এর প্রভাব খারাপ হওয়ার সম্ভাবনা আছে।

ড্রাগনস্টোন

ড্রাগনস্টোনের প্রথম দৃশ্যটি ড্রাগনগ্লাস খনির। গতপর্বে ডেনেরিস জনকে খনি থেকে ড্রাগনগ্লাস উত্তোলনের অনুমতি দিয়েছিল। এবারে জন সে খনিতে ডেনেরিসকে নিয়ে গেল। চাপা সুড়ঙ্গের ভেতর দিয়ে গিয়ে একটু প্রশস্ত হতেই দেখা গেল পাহাড়ের ভেতরে থরে থরে জমে আছে ড্রাগনগ্লাস। পুরো সাম্রাজ্যের হাতেই এর বানানো অস্ত্র তুলে দেয়া যাবে। খনির ভেতরে আরও পাওয়া গেছে দেয়াল-চিত্র। প্রায় আট হাজার বছরেরও আগে এই ছবিগুলো খোদাই করা হয়েছিল। সেসময় ওয়েস্টেরোসে মানুষের পাশাপাশি আরেক প্রজাতির প্রাণী বসবাস করতো, যাদেরকে মানুষরা ‘চিলড্রেন অফ দ্যা ফরেস্ট’ বলতো। জাদুতে পারদর্শী বালক-বালিকা চেহারার এই প্রাণীর সাথে দীর্ঘ দুই হাজার বছর মানুষের যুদ্ধ চলেছে।  মূলত মানুষকে (তখনকার মানুষকে ‘ফার্স্ট মেন’ বলা হতো) ঠেকাতেই তারা জাদুবিদ্যার সাহায্যে হোয়াইট ওয়াকার বা “আদারস্‌” সৃষ্টি করেছিল। তারপর ডক্টর ফ্র্যাংকেস্টাইনের সৃষ্টির মতো হোয়াইট ওয়াকাররা একইসাথে মানুষ আর চিলড্রেনদের অমোঘ শত্রু হয়ে ওঠে। চিলড্রেনদের বানানো সর্পিলাকার নকশাও এখানে অনেকবার খোদাই করা হয়েছে। চিলড্রেন আর ফার্স্ট মেন একসাথে মিলেই হোয়াইট ওয়াকারদের হারিয়েছিল। জন ডেনেরিসকে এগুলো দেখিয়ে প্রকারান্তরে তার আগের অনুরোধ বোঝাতে চাইলো। যদিও এরা দুইজনই একগুঁয়েমিতে কেউ কারো চেয়ে কম যায় না। ডেনেরিস জনকে সাহায্য করতে রাজি হলো, তবে সেখানেও শর্ত আনুগত্যের। জনকে নতিস্বীকার করতেই হবে।

Jon: “My people won’t accept a southern ruler. Not after everything they’ve suffered.”

Daenerys: “They will if their king does.”

ডেনেরিস এখানে উত্তরের লর্ডদের চিনতে কিছুটা ভুল করছে। এসোসে যেমন সবাই তার আশ্চর্যজনক সব ক্ষমতা দেখে কিংবা তার চরিত্রের দৃঢ়তা দেখে খুশি হয়ে তার অনুসারী হয়েছে, ওয়েস্টেরোসের নর্থের লর্ডরা তেমনভাবে চিন্তা করে না। তাদের চোখে স্টার্ক তথা উইন্টারফেল হলো চূড়ান্ত অভিভাবক। উইন্টারফেলের লর্ড খারাপ হলে তারা নীরবেই সেই লর্ডের কথা শুনবে, ভাল হলে ভাল কথা শুনবে। লর্ড কেমন হওয়া উচিত বা হলে ভাল হয় – এরকম সিদ্ধান্ত নিয়ে তারা মাথা ঘামায় না। কিন্তু জন সরাসরি লর্ড অফ উইন্টারফেল না। সেই হিসেবে বংশগত দাবি সানসার, তারপরে ব্র্যানের। তাই জনের প্রতিটা সিদ্ধান্তই ঘুরে-ফিরে যাচাই-বাছাই করে সকলেই। পদে পদে নিজের সামর্থের পরিচয় দিয়েই তাকে রাজা হবার যোগ্য ভেবেছে নর্থের লর্ডরা। এসোসের অনেক জায়গায় জারজের ধারণাই অনুপস্থিত, যেমন মিসান্দেই বললো। তাই ওয়েস্টেরোসে জারজদের কী চোখে দেখা হয় সেটা ডেনেরিস আন্দাজ করতে পারছে না। জনের পক্ষে আর দশটা রাজার মতো যা ইচ্ছা তাই করার সুযোগ নেই। তার লক্ষ্য নর্থের মানুষকে রক্ষা করা। নতি স্বীকার করে নর্থের কোন উপকার হবে না, তাই জন এই ব্যাপারটাকে একেবারেই পাত্তা দিচ্ছে না।

দ্বিতীয়ত দুইজনের চরিত্রের কূটনৈতিক চিন্তাভাবনার অভাব আছে। এখানে ড্যাভোস, টিরিয়ন, বা জোরাহ’র পরামর্শগুলো তাদের দুইজনেরই অনমনীয়তার অবস্থানকে মোলায়েমভাবে সরানোর চেষ্টা করে বা করতো। হয়তো গ্রেস্কেল সারিয়ে ফিরে আসা জোরাহ’র কথাতে এই অচলাবস্থার নিরসন হবে। যদিও আরেকটি সম্ভাবনা মনে উঁকি দিচ্ছে। জন আর ডেনেরিস আলো-আঁধারি গুহায় যেভাবে একে অপরের দিকে তাকাচ্ছিল, জন যেভাবে ডেনেরিসের হাত ধরে নিয়ে যাচ্ছিল, তাতে মনে হচ্ছে এদের মাঝে মন দেয়া-নেয়ার ব্যাপার ঘটে যেতে পারে। আর কে না জানে, ভালোবাসার চেয়ে মজবুত আঠা আর হয় না। হতে পারে এই দুই অনড় রাজা-রাণীর মিলনে অচলাবস্থা কাটবে। বরফ আর আগুনের সঙ্গীত বেজে উঠবে সাত সুরে।

ব্ল্যাকওয়াটার রাশ

এর মাঝেই ক্যাস্টারলি রকে আনসা’লিডদের এবং হাইগার্ডেনে টাইরেলদের দুরাবস্থার খবর এলো। প্রথম ধাক্কায় গ্রেজয় আর স্যান্ড স্নেক হারিয়েছিল ডেনেরিস। এবারে দ্বিতীয় আঘাতে পদাতিক বাহিনীর বাকিটুকুও হারিয়ে ফেললো সে। একমাত্র ডোথরাকি অশ্বারোহী আর ড্রাগনগুলো ছাড়া তার হাতে আর কিছুই নেই।

“Enough with the clever plans.”

ডেনেরিসের আক্রমণ পথ
ডেনেরিসের আক্রমণ পথ

ল্যানিস্টারদের পুরো সৈন্যবাহিনী জেইমির নেতৃত্বে হাইগার্ডেন থেকে ফিরছিল রোজ রোড ধরে। প্রায় কিংস ল্যান্ডিংয়ের কাছাকাছি এসে ব্ল্যাকওয়াটার রাশ নদী পার হতে হবে। দীর্ঘ পথে আসতে আসতে কাফেলার শুরু আর শেষ অনেক ছড়িয়ে গেছে। জেইমি, ব্রন, র‍্যান্ডিল ও ডিকন টার্লি ছিল পেছনের দিকে। র‍্যান্ডিল টার্লি এসে জানালো যে সোনাদানার অংশ নদী পেরিয়ে কিংস ল্যান্ডিংয়ের একদম কাছে পৌঁছে গেছে। বাকি আছে পেছনের দিকের শস্যমজুদের গাড়িগুলো। ঠিক এর পরই বিশাল অশ্বারোহী ডোথরাকি বাহিনী আক্রমণ। সাথে ড্রোগনের পিঠে সওয়ার ডেনেরিস টারগারিয়েন।

“Only a fool would meet the Dothraki in an open field.” – Robert Baratheon

এই প্রথমবারের মতো ডোথরাকিদের আক্রমণ আর ধ্বংসযজ্ঞের ভয়াবহতা পুরোমাত্রায় দেখা গেল। এমনিতেই ল্যানিস্টাররা অপ্রস্তুত ছিল। সাথে বড় বড় ক্যারাভান থাকায় গতিও ছিল ধীর, লম্বা সফরের ক্লান্তিও কাজ করে থাকবে। কিন্তু ডোথরাকিরা যে গতিতে আর যে ছন্দে এসে আছড়ে পড়লো তা সত্যিই ভয়ানক। কেউ কেউ দুই হাতে দুইটা আ’রাখ ঘোরাতে ঘোরাতে ঘোড়াকে শুধুমাত্র দুই পায়ের সাহায্যে চালাচ্ছিল। কেউ আবার লাফ দিয়ে ঘোড়ার পিঠে উঠে দাঁড়িয়ে দৌড়াতে দৌড়াতেই তীর মারছিল। অন্যদিকে ল্যানিস্টাররা প্রথাগত বর্মের আড়ালে বর্শার প্রতিরক্ষা দিয়ে এই তীব্র আঘাত ঠেকানোর চেষ্টা করলো। ফলাফল যা হবার তাই হলো, একদম কচুকাটা। এমন কাটাই কাটলো যে কচুর আর কিছুর হদিস পাওয়া গেল না। আবার মরার ওপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে এসেছে ড্রোগন। ডেনেরিস “ড্রাক্যারিস!” বলার সাথে সাথে আগুনের হলকায় মুহূর্তেই পুড়ে গেল ল্যানিস্টার সৈন্যরা। গত সিজনে তিন ড্রাগনের নৌবাহিনী ধ্বংসযজ্ঞ দেখা গিয়েছিল। সেসময় খুব কাছে গিয়ে মানুষের মৃত্যুগুলো দেখানো হয়নি। কিন্তু এই পর্বে যেভাবে দাউদাউ আগুনে আপাদমস্তক জ্বলে পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছিল সৈন্যরা তা সত্যিই ভয়াবহ দৃশ্য ছিল। যুদ্ধক্ষেত্রের একটু দূর থেকে টিরিয়ন যখন এই হত্যাকাণ্ড দেখছিল তখন তার মুখের অভিব্যক্তিই বলে দিচ্ছিল কতটা ভয়ঙ্কর অনুশোচনা অনুভব করছে সে। ল্যানিস্টারদের মধ্যে একমাত্র ব্রনের লড়াই আরেকটা দেখার মত দৃশ্য ছিল। বরাবরই স্বার্থপর আর সুযোগসন্ধানী ব্রন এই ধ্বংসযজ্ঞের মাঝে ঠিকই মাথা ঠাণ্ডা করে পাল্টা আঘাত হানতে পারলো। কাইবার্নের বানানো ‘স্করপিয়ন’ বর্শা দিয়ে এক ডোথরাকিকে মারল। তারপর পরপর দুইবার চেষ্টা করে ঠিকই ড্রোগনের গায়ে আঘাত হানতে পারল। আবার একদম শেষ মুহূর্তে যখন জেইমি দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে ডেনেরিসকে মারতে যাচ্ছিল, তখন ঠিকসময়ে এসে ধাক্কা দিয়ে তাকেও বাঁচিয়ে দিল।

এই যুদ্ধের শেষে ল্যানিস্টার বাহিনীর ছাই ছাড়া কিছু বাকি থাকবে না। জেইমি আর ব্রন বেঁচে গেল এযাত্রা, কিন্তু বন্দী হলে আবারও নাজুক অবস্থায় পড়ে যাবে সার্সেই। বহু পরিকল্পনা করে ঋণ চুকানোর সোনা পেলেও শস্যদানার অভাবে অচিরেই রাজধানীতে খাদ্যাভাব দেখা দিবে। সত্যি বলতে কি, এই অবস্থা থেকে ঘুরে দাঁড়ানো প্রায় অসম্ভবের কাছাকাছি। অন্যদিকে ডেনেরিস নিশ্চিতভাবে জিতলেও ড্রোগনের আহত হওয়া তার জন্য সতর্কবাণী হয়ে এলো। প্রতিপক্ষকে কোন অবস্থাতেই হালকাভাবে নিতে হয় না। আরেকটু এদিক ওদিক হলেই আরো গুরুতর বিপদ হতে পারতো।

ল্যানিস্টার-টার্লি বাহিনী বনাম টারগারিয়েন বাহিনীর এই লড়াইটি প্রায় পুরোপুরি ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি করেছে। ডেনেরিসের পূর্বপুরুষ এয়গন টারগারিয়েন যখন প্রথম ওয়েস্টেরোস দখল করতে এসেছিল, তখনো ‘রক’ আর ‘রিচ’ রাজ্যের রাজাদ্বয় এভাবেই যুদ্ধের ঘোষণা দিয়েছিল। তখন হাইগার্ডেনের হাউজের নাম ছিল ‘গার্ডেনার’। এয়গন টারগারিয়েন ও তার দুই বোন ও স্ত্রী ভাইসেনিয়া ও রেয়নিস তাদের তিন ড্রাগন নিয়ে মাত্র  হাজার দশেক সৈন্য নিয়ে যুদ্ধে নেমেছিল। অন্যদিকে রক আর রিচের রাজার মিলিত সৈন্যবাহিনী ছিল প্রায় ৫৫ হাজারের মতো। কিন্তু তিন ড্রাগনের ত্রিমুখী আগুনের সামনে এত বড় বাহিনীও পুড়ে ছাই হয়ে ছত্রভঙ্গ হয়ে গিয়েছিল। এই যুদ্ধের পর হাউজ গার্ডেনার বিলুপ্ত হয়ে যায়। তার জায়গায় হাইগার্ডেনের স্টুয়ার্ড হাউজ টাইরেলদের এয়গন ক্ষমতায় বসান। সেই যুদ্ধক্ষেত্রে পড়ে থাকা তলোয়ার দিয়েই এয়গন তার আয়রন থ্রোন বানিয়েছিল। আজ প্রায় তিনশ বছর পর টাইরেলরাও বিলুপ্ত, সাথে পুড়ে গেল রিচ ও রক রাজ্যের বিশাল গর্বের সৈন্যবাহিনী। এক ড্রাগনেই এই অবস্থা, অন্য দুই ড্রাগন আনলে কী অবস্থা হতো সেটাই ভাবার বিষয়!

Field of Fire

“It was the only time that Vhagar, Meraxes, and Balerion were all unleashed at once. The singers called it the Field of Fire.”

– Tyrion Lannister (A Game of Thrones)

এই পর্বের যুদ্ধের দামামার পাশাপাশি প্রায় প্রতিটি চরিত্রই নিজেদের স্বরূপে আবির্ভূত হয়ে উঠেছে। একদিকে উইন্টারফেলে স্টার্ক সন্তানেরা যার যার স্বভাবের বিশেষ ক্ষমতা বা বৈশিষ্ট্যগুলো প্রকাশ করছে। অন্যদিকে ড্রাগনস্টোনে জন ও ডেনেরিসের কথায় তাদের স্বরূপ আরো প্রকাশিত হচ্ছে। যুদ্ধক্ষেত্রে প্রকৃত নাইটের মতো জেইমির স্বরূপও প্রকাশিত হলো। চাইলেই সে পালিয়ে কিংস ল্যান্ডিংয়ে আশ্রয় নিতে পারতো, এমনকি ব্রন সে কথা বলেওছিল। কিন্তু নিজের সৈন্যদের ত্যাগ না করে জেইমি তার চরিত্রের সবচেয়ে শক্তিশালী বৈশিষ্ট্যকে আবার সামনে নিয়ে এল। ব্রনের স্বার্থপর মুখোশের আড়ালে লুকিয়ে থাকা সাহসী বীরের রূপ বেরিয়ে এল। আর ডেনেরিস এতদিনের বাঁধ দিয়ে রাখা কূটনৈতিক কৌশল বাদ দিয়ে নিজের সন্তানের পুরো শক্তির ভয়াবহ এক প্রদর্শন করলো। স্টার্করা যেমন নিজেদের বাড়িতে ফিরেই একেকজন দক্ষতাগুলো শানিয়ে নিচ্ছে, তেমনি ডেনেরিসও এতদিনের সংযমের পর এখন নিজের ক্ষমতার পুরো বহিঃপ্রকাশ করলো। সব মিলিয়ে চমৎকার উপভোগ্য একটি পর্ব।

Anik Andalib

Teacher by profession. Writer by passion. Loves to read and write about science, literature, films, and TV shows.