গেম অফ থ্রোনস: ৭.০৬: রিভিউ

গেম অফ থ্রোনসের সপ্তম সিজনের ষষ্ঠ পর্বের নাম “বিয়ন্ড দ্যা ওয়াল”। গত পর্বের শেষে জন, টরমুন্ড, জোরাহ, হাউন্ড, বেরিক, থোরোস ও গেন্ড্রি মিলে ওয়ালের ইস্টওয়াচ-বাই-দ্যা-সি প্রাসাদের উত্তরে রওনা দিয়েছিল। তাদের উদ্দেশ্য ছিল ডেনেরিস ও সার্সেইয়ের জন্য প্রমাণস্বরূপ মৃতবাহিনীর ওয়াইট (wight) ধরে নিয়ে আসা। পর্বের অধিকাংশ জুড়ে তাদের এই অভিযান দেখা গেছে। এছাড়া গত পর্বে উইন্টারফেলে আরিয়া লিটলফিঙ্গারের ঘর থেকে একটা চিঠি উদ্ধার করে। আরিয়াকে প্রভাবিত করার জন্য লিটলফিঙ্গার নিজেই চিঠিটা রেখেছিল। এই চিঠিটা অনেক বছর আগে রবার্ট ব্যারাথিয়ন মারা যাওয়ার পর সানসা লিখেছিল, বলা যায় লিখতে বাধ্য হয়েছিল। আগের পর্ব দেখে এমন অনুভূতি হয়েছিল যে নির্দিষ্ট একটি লক্ষ্যে সিজনের মূল গল্পকে চালিত করতে বিভিন্ন চরিত্রকে দিয়ে জোর করেই অনেক কিছু বলানো বা করানো হচ্ছে, যা তাদের চরিত্রের সাথে যায় না। এই পর্বেও এরকম বেশ কিছু অসঙ্গতি চোখে পড়েছে।

উইন্টারফেল

আরিয়ার এই পরিবর্তিত আচরণ এতদিন আমরা তাকে যেমন দেখে এসেছি তার সাথে খাপ খাচ্ছে না।

উইন্টারফেলের পুরো ঘটনা এখন আরিয়ার প্রতিক্রিয়ায় সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে। চিঠিটা পাওয়ার পরে সে সরাসরিই সানসাকে জেরা করতে শুরু করে। যদিও মনে হচ্ছে প্রশ্ন করার আগেই সে মনস্থির করে ফেলেছে যে সানসা সজ্ঞানে এই চিঠিটা লিখেছিল। আরিয়ার এই পরিবর্তিত আচরণ এতদিন আমরা তাকে যেমন দেখে এসেছি তার সাথে খাপ খাচ্ছে না। প্রথমত, প্রতিটা মানুষেরই কিছু নিবিড় বিশ্বাস থাকে যার শেকড় তার মননের গভীরে প্রোথিত। বাইরের যত ঝড়-ঝাপ্টাই আসুক তাদের সেই শেকড়ে গেঁথে থাকা বিশ্বাস উপড়ে ফেলা যায় না। আরিয়ার বেড়ে ওঠার সময় থেকে হাউজ অফ ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইটে ফেসলেস ম্যান-এর প্রশিক্ষণ পর্ব পর্যন্ত বহুবার তাকে ছদ্মবেশ ও ছদ্মপরিচয়ে টিকে থাকতে হয়েছে। প্রতিকূল পরিবেশে বারবার সে নিজের পরিচয় লুকিয়েছে। আর প্রশিক্ষণের সময় তো আক্ষরিক অর্থেই তাকে ‘মুখোশ’ পরতে হতো। এতকিছুর পরেও তার স্টার্ক পরিচয় সে ছাড়তে পারে নি। যে কারণে তাকে শেষমেশ প্রশিক্ষণ অসমাপ্ত রেখেই ওয়েস্টেরোসে ফিরতে হলো। এই স্টার্ক পরিচয়ের গোড়ায় আছে তার নিজের পরিবারের প্রতি টান। বিনাশর্তেই সে তার বাবা-মা, ভাই-বোনদেরকে ভালবাসে। সেই আরিয়া এমন কোন চিঠি পড়লে কখনই এভাবে সানসার ওপর ক্ষেপে উঠবে না। মনে রাখা দরকার যে এই চিঠি যখন প্রথম এসেছিল, তখন রব স্টার্ক বা মেয়স্টার লুইন কেউই বিশ্বাস করেনি যে সানসা সজ্ঞানে এই চিঠি লিখেছে। বরং তারা নিশ্চিত ছিল এটা সার্সেই যেনতেনভাবে সানসাকে দিয়ে লিখিয়েছে।

দ্বিতীয়ত, আরিয়া নানা ঘাটের জল খেয়ে আসা মেয়ে। লিটলফিঙ্গারের ঘর থেকে সে লুকানো চিঠিটা চুরি করেছে। সানসাকে প্রশ্ন করার আগে অন্তত পরদিন পর্যন্ত অপেক্ষাও করেছে (চিঠিটা নিয়েছিল রাতে, সানসার সাথে কথা বলছে দিনে)। এর মাঝে লিটলফিঙ্গার নিশ্চয়ই টের পাওয়ার কথা, এবং চিঠিটা কোথায় গেল তা খোঁজার কথা। অথচ লিটলফিঙ্গারের হাবে-ভাবে তা মনে হচ্ছে না। আরিয়ার মনে এই প্রশ্ন আসা উচিত ছিল। তাছাড়াও, এই চিঠিটা সে কেনই-বা লিটলফিঙ্গার এত খুঁজে-টুজে বের করেছে? সানসাকে লেডি অফ উইন্টারফেল থেকে সরিয়ে দিতে? উইন্টারফেল নিজে দখল করতে? নাকি সানসা ও আরিয়ার মাঝে বিভেদ তৈরি করতে? যদি প্রথম দুটো প্রশ্নের উত্তর ‘হ্যাঁ’ হয়, তাহলে লিটলফিঙ্গার আসল প্রতারক – এটাও আরিয়ার মাথায় আসা উচিত। যদি তৃতীয় প্রশ্নটির উত্তর ‘হ্যাঁ’ হয়, তাহলে আরিয়া হয়তো সব জেনে বুঝেই ক্ষেপে যাওয়ার ‘অভিনয়’ করছে। লিটলফিঙ্গার আগে থেকেই তাহলে জানতো যে আরিয়া তাকে অনুসরণ করছে। তাই তাকে দেখিয়ে দেখিয়ে চিঠিটা আনিয়েছে, ঘরে লুকিয়ে সরে গিয়ে আরিয়াকে সেটা চুরি করতে দিয়েছে। আরিয়া একটু ঠাণ্ডা মাথায় ভাবলেই বিষয়টা পরিষ্কার হয়ে যাওয়ার কথা।

সানসার সাথে লিটলফিঙ্গারের কথোপকথনেও পুরো বিষয়টার সত্যতা নিয়ে সন্দেহ হচ্ছে।

উইন্টারফেলের শেষ দৃশ্যটিতে সানসা যখন আরিয়ার ঘরে গিয়ে মৃত মানুষের মুখোশগুলো দেখে, তখন আরিয়া তার সাথে মিথ্যা বলার খেলা খেলে। “Game of faces” নামের এই খেলায় একজন আরেকজনকে প্রশ্ন করে। উত্তরে সে মিথ্যা কথাকে সত্যির মতো করে বলার চেষ্টা করে, আর প্রশ্নকারী তার মিথ্যা কথাকে ধরার চেষ্টা করে। ব্র্যাভোসের হাউজ অফ ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইটে জাকেন হ্যাগারের সাথে আরিয়া এই খেলাটি খেলেছিল। যতবারই আরিয়া মিথ্যা উত্তর দিয়েছিল, জাকেন সেটা ধরতে পেরে তাকে লাঠি দিয়ে মেরেছিল। আরিয়া সেই একই খেলা সানসার সাথে খেলল। খেয়াল করলে দেখা যায় আরিয়ার প্রশ্নের (তুমি কি মনে কর জনের জায়গায় অন্য কারো নর্থ শাসন করা উচিত?) উত্তর সানসা দেয় নি। সানসার প্রশ্নের জবাবে আরিয়া নির্বিকারচিত্তে তাকে খুন করার কথা বললো। যদি আগের দৃশ্যে আরিয়ার রেগে ওঠা ভান হয়ে থাকে, তাহলে এই শীতল কণ্ঠের খুনের হুমকিকেও ভান হিসেবে ধরার অবকাশ থাকে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে সানসাকে না জানিয়ে এই অভিনয়ের সার্থকতা কোথায়? সানসা তার হুমকিকে সত্য ধরে যদি অমোচনীয় কোন ভুল করে বসে, তাহলে সে পরিস্থিতি সামাল দিবে কীভাবে? লিটলফিঙ্গারের স্বরূপ উন্মোচন করতে গিয়ে নিজেদের মাঝের সম্পর্কে ফাটল ধরানো কি আদৌ বুদ্ধিমানের কাজ হচ্ছে? তার কাছে কোনটা বেশি জরুরি, লিটলফিঙ্গারের অপসারণ, নাকি সানসার সাথে তার সম্পর্ক? যত যাই হোক, আরিয়ার কাছে সবসময়ই তার পরিবার সবচেয়ে আপন ছিল। সুতরাং আরিয়ার এহেন প্রতিক্রিয়া তার চরিত্রের সাথে যায় না।

“They turned their backs on Jon when it was time to retake Winterfell and then they named him their king and now they’re ready to turn their backs on him again.”

সানসার সাথে লিটলফিঙ্গারের কথোপকথনেও পুরো বিষয়টার সত্যতা নিয়ে সন্দেহ হচ্ছে। সানসা কোন অবস্থাতেই লিটলফিঙ্গারকে বিশ্বাস করে না। একথা সে একাধিকবার বলেছে। কিন্তু আরিয়া তাকে জেরা করা মাত্রই সে কয়েক বছর আগের অবুঝ কিশোরীর মতো লিটলফিঙ্গারকে গড়গড় করে সব বলে দিচ্ছে, এটা হজম করা বেশ কষ্টকর। সানসার এসময়ের কথাগুলোও ঠিক খাপ খায় না। নর্থের বিভিন্ন হাউজের লর্ডদের ওপর তার আস্থা নেই, অথচ এই হাউজগুলোই হাজার বছর ধরে স্টার্কদের অনুগত থেকেছে। একমাত্র বোল্টনরা বাদে প্রায় কোন হাউজই স্টার্কদের সাথে সরাসরি বিরোধিতায় যেত না। পুরো সিরিজের গত পাঁচ ছয় সিজন ধরেই আমরা বিভিন্নভাবে দেখেছি যে নর্থের হাউজগুলোর একাত্মতা কতটা দৃঢ়। মনে হচ্ছে সানসা নিজেই ভুলে গেছে যে The North Remembers, কিংবা গল্পের প্রয়োজনে জন বা সানসার মুখ দিয়ে বারবার এটা শোনানো হচ্ছে জোর করে যে নর্থের লর্ডরা স্টার্কদের প্রতি ভরসা রাখে না। এই বেমানান সংলাপ আর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য দিয়ে একটি অপ্রয়োজনীয় প্লট গড়ে তোলা হচ্ছে, যা আদৌ দরকার ছিল না। উত্তরে ওয়ালের ওপার থেকে আসা বিপদের ব্যাপারে নর্থ সবচেয়ে বেশি ওয়াকিবহাল। প্রত্যেকেই নানাভাবে নানাজনের কাছ থেকে হোয়াইট ওয়াকার এবং মৃতবাহিনীর ব্যাপারে এত বেশি শুনেছে যে তাকে উড়িয়ে দিতে পারছে না দক্ষিণের মেয়স্টার বা রাণীদের মতোন। জনের মত একজন জারজকে রাজা বানানোর পেছনেও প্রধানতম কারণ ছিল এই আসন্ন যুদ্ধ। অথচ তারাও দক্ষিণের হাউজগুলোর মতো তুচ্ছ মারামারিতে ব্যস্ত থাকবে এটা একেবারেই মিলছে না। গত পর্বে যখন তারা সানসার সামনে জনের অনুপস্থিতি নিয়ে নাখোশি প্রকাশ করছিল, তখন হোয়াইট ওয়াকারদের কথা আসতে পারতো। তাদের ঠেকানোর সমর্থন জোগাতেই জন গিয়েছে, তাই নর্থের ব্যানারম্যানদের এরকম অস্থির হওয়ার কোন কারণ নেই। নেড বা রব যখন উইন্টারফেল ছেড়ে গিয়েছিল, তখন কোন নর্থের ব্যানারম্যানই এমন অনাস্থা দেখায়নি। অনুরূপ ঘটনা র‍্যান্ডিল টার্লি ও অন্যান্য টাইরেল ব্যানারম্যানদের প্রতারণাতেও দেখা গেছে। শত শত বছরের আনুগত্য এত সহজেই যদি ছুঁড়ে ফেলা যেত, তাহলে অনেক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধই শুরু আগে শেষ হয়ে যেতো। এই বিশ্বনির্মাতার মূল বই বা প্রথম দিকের সিজনে এমন খামখেয়ালিপনা খুঁজে পাওয়া যাবে না।

কিংস ল্যান্ডিং থেকে সানসার কাছে চিঠি এসেছে। সে চিঠিতে রাজধানীতে যাওয়ার ‘আমন্ত্রণ’।

এই পর্বে সার্সেইয়ের কোন দৃশ্য ছিল না, তবু তার প্রসঙ্গ এসেছে। কিংস ল্যান্ডিং থেকে সানসার কাছে চিঠি এসেছে। সে চিঠিতে রাজধানীতে যাওয়ার ‘আমন্ত্রণ’। সার্সেই একইসাথে ডেনেরিস এবং সানসাকে ডেকেছে, আবার গোল্ডেন কোম্পানির মাধ্যমে কোন মূল্যবান জিনিস উদ্ধারের চেষ্টা করছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে সামনের ফিনালেতে কিংস ল্যান্ডিংয়ে কোন বড়সড় ঘটনা ঘটে যেতে পারে। সানসা সেই আমন্ত্রণে নিজে না গিয়ে ব্রিয়েনকে পাঠিয়ে দিল। এই সিদ্ধান্তেও মনে হচ্ছে আরিয়া আর সানসার ভেতরের টানাপোড়েন আসলে বানানো। কারণ যদি সানসা সত্যিই নিজের প্রাণের ভয় করতো, তাহলে অন্তত ব্রিয়েনকে রেখে দিতো।

ড্রাগনস্টোন

You’ve been thinking about my death quite a bit, haven’t you? Is this one of the items you’ve discussed with your brother in King’s Landing?

“Heroes do stupid things and they die. Drogo, Jorah, Daario, even this… Jon Snow.”

ড্রাগনস্টোনে টিরিয়ন এবং ডেনেরিসের দৃশ্যেও কয়েকটি বেমানান ব্যাপার চোখে পড়ল। বিশেষ করে ডেনেরিসের এই উক্তির কারণ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। যদি জন ও তার বাহিনীর উত্তরে যাওয়া এবং ওয়াইট ধরে আনার পরিকল্পনা বোকার মতই হয়ে থাকে, তাহলে ডেনেরিস তাতে সম্মতি জানালো কেন? টিরিয়নও সেই পরিকল্পনাকে বোকার মতো বলার বিরোধিতা করলো না, স্বপক্ষের কোন যুক্তি দিলো না, যদিও এতে প্রাথমিক সমর্থন তার কাছ থেকেই এসেছিল। বরং তার জবাব ছিল ছেলেমানুষি রসাত্মক ইঙ্গিতের দিকে। ডেনেরিস মনে মনে জনের প্রতি দুর্বল, সেটা সে নিজেও বুঝতে পারে না, তাই তার ‘সখী’রূপী টিরিয়ন তাকে চোখ টিপে বুঝিয়ে দিচ্ছে যেন! তার চেয়েও বড় কথা, দ্রোগো বাদে বাকিরা কেউই মরেনি। জোরাহ ঠিক কোন ‘বোকামি’ করলো? বরং সে বরাবরই ডেনেরিসের প্রতিরক্ষার দায়িত্ব পালন করেছে নিজের জীবন বাজি রেখে। দারিও নাহারিস তো বহাল তবিয়তেই আছে, পুরো মিরিনের রক্ষাকর্তা এখন সে। তার কাছ থেকে যেহেতু কোন গুরুত্বপূর্ণ খবর আসছে না, তার মানে মিরিনের কর্তার দায়িত্ব সে ভালই পালন করছে। এতটা ভাল তো ডেনেরিসও পারেনি। হয়তো শুধু জন আর ডেনেরিসের সস্তা মেলোড্রামাময় প্রেম দেখানোর জন্যেই এই রকম সংলাপের অবতারণা।

এই দৃশ্যে আরো একবার ডেনেরিস আর টিরিয়নের মাঝের অস্বস্তিকর সন্দেহ মাথা বের করলো। আগের এক পর্বে সে টিরিয়নের বিশ্বস্ততা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল। টিরিয়ন তলে তলে নিজের পরিবারকে বাঁচিয়ে দিচ্ছে, এমন পরিকল্পনা করছে যেন জেইমি ও সার্সেই সহজেই যুদ্ধে জিততে পারে – এরকম অভিযোগ বেশ গুরুতর। এই পর্বেও ডেনেরিসের উত্তরসূরীর প্রসঙ্গ আসায় আবারও ডেনেরিস বললো, “You’ve been thinking about my death quite a bit, haven’t you? Is this one of the items you’ve discussed with your brother in King’s Landing?” স্পষ্টতই গুরুতর অভিযোগ। আগেই বলেছিলাম টিরিয়নকে একা একা জেইমির সাথে দেখা করতে দেয়াটা শাসক হিসেবে একটি ভুল সিদ্ধান্ত। যত বিশ্বস্তই হোক না কেন, তার সাথে আরেকজন অনুচর দেয়া উচিত ছিল। টিরিয়ন আর জেইমির মাঝে কী কী কথা হয়েছে, তা জানার একমাত্র উৎস টিরিয়ন নিজেই। একারণেই ডেনেরিস তার ওপর পুরোপুরি ভরসা করতে পারছে না। বারবার নানাপ্রসঙ্গে তাই এই অনাস্থার প্রভাব দেখা যাচ্ছে।

চরিত্রের দিক থেকে টিরিয়নও এই সিজনে যথেষ্টই নাজুক আর খেলো হয়ে গিয়েছে। দ্বিতীয় বা তৃতীয় সিজনের বুদ্ধিদীপ্ত, সুচতুর টিরিয়ন এখন একের পর এক বাজে সিদ্ধান্ত ও বোকা বোকা সংলাপ আওড়াচ্ছে। ডেনেরিসের নিজের প্রজ্ঞাও আগে অতো বেশি ছিল না। হয়তো তাকে সবচেয়ে বুদ্ধিমান সাজানোর জন্যেই টিরিয়নকে জোর করে বোকা বানিয়ে দেয়া হয়েছে। অনুরূপ ঘটনা সার্সেইয়ের বেলাতেও ঘটেছে। এতদিন ধরে যে চরিত্র বোকার মতো ধর্মগুরুর ফাঁদে পা দিয়েছিল, কিংবা টাইরেলদের রাজনীতি বুঝতে না পেরে জফ্রির মৃত্যুর জন্য নিজের ভাইকেই দায়ী করেছিল, সেই চরিত্র এখন ওয়েস্টেরোসের সবচেয়ে ধুরন্ধর রাজনীতিবিদ। সার্সেইয়ের বোকামোর চূড়ান্ত খেসারত দিতে হয়েছে টাইউইনকে। এবং সিরিজ-নির্মাতারা টাইউইনের মতো আরেকজন রাজনীতিবিদের চরিত্র গড়ে তোলার বদলে সার্সেইকেই বদলে নিয়েছেন।  এতটাই যে ধীরে ধীরে খলনায়ক থেকে নায়কে রূপ নেয়া জেইমিও তার চারপাশে নির্বুদ্ধিগণেশের মত কথাবার্তা বলছে। এই সিজনে জেইমির মূল অভিনয়ের অনেকটাই হলো অবাক বা হতভম্ব চেহারা করা। কখনো সার্সেই, কখনো ইউরন, কখনো ড্রোগনকে দেখে কিছুটা বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে থাকাই তার মত চরিত্রের পরিণতি।

বিয়ন্ড দ্যা ওয়াল

পটভূমি যতই বেমানান হোক, এই পর্বের সবচেয়ে সুন্দর ও আকর্ষণীয় অংশগুলো ছিল ওয়ালের উত্তরে সাতজনের অভিযান। আগের পর্বের রিভিউতেই বলেছি এদের মাঝে অনেকেরই আগের পরিচয় আছে। যেমন গেন্ড্রিকে ব্রাদারহুড উইদাউট ব্যানারস দল পাকড়াও করেছিল। সেই দলের নেতা ছিল বেরিক ডনডারিয়ন এবং সদস্য ছিল থোরোস অফ মির। গেন্ড্রির ইচ্ছা ছিল ব্রাদারহুডে যোগ দিয়ে তাদের সাথে রিভারল্যান্ড রাজ্যের বনে-বাদাড়ে থাকবে। কিন্তু তারা তাকে মেলিসান্দ্রের কাছে কিছু টাকার বিনিময়ে বেচে দিয়েছিল। স্যার জোরাহ আর থোরোসেরও আগে থেকে পরিচয় আছে। তারা একসাথে যুদ্ধ করেছিল গ্রেজয় বিদ্রোহের সময়। সেই যুদ্ধের স্মৃতিচারণ এই পর্বে ঘটলো। বিদ্রোহীদের দমন করতে পাইক দ্বীপের ফটক ভেঙে সবার আগে ঢুকে পড়েছিল জোরাহ এবং থোরোস। মদ্যপ থোরোসের অবশ্য সে ঘটনার কিছুই মনে নেই। যুদ্ধশেষে অন্যদের কাছে শুনেছে, তার জ্বলন্ত তলোয়ার দেখে বিদ্রোহীরা কেমন আতঙ্কিত হয়েছিল।

পটভূমি যতই বেমানান হোক, এই পর্বের সবচেয়ে সুন্দর ও আকর্ষণীয় অংশগুলো ছিল ওয়ালের উত্তরে সাতজনের অভিযান।

পুরো দলের মধ্যে হাউন্ডই একমাত্র যার আগে থেকে কারো সাথে তেমন খাতির নেই। অতিসম্প্রতি বেরিক আর থোরোসের সাথে জুটে গেছে সে। তাই এই পর্বে তার সাথে টরমুন্ডের একটু পরিচয়ের দৃশ্য দেখা গেল। কথাপ্রসঙ্গে টরমুন্ড হাউন্ডকে ব্রিয়েন অফ টার্থের বর্ণনা দিতেই হাউন্ড তাকে চিনতে পারলো। না চেনার কোন কারণ নেই, পুরো ওয়েস্টেরোসে ব্রিয়েনের মত আর কেউ নেই। হাউন্ডেরও মনে আছে, ব্রিয়েনের সাথে লড়াইয়ে প্রায় মরতে বসেছিল সে। ক্ষতবিক্ষত অবস্থায় এক পাহাড়ের ঢালে পড়েছিল। এক দয়ালু ফকিরবাবা এসে না বাঁচালে সেখানেই তার ভবলীলা সাঙ্গ হতো।

কথাপ্রসঙ্গে টরমুন্ড হাউন্ডকে ব্রিয়েন অফ টার্থের বর্ণনা দিতেই হাউন্ড তাকে চিনতে পারলো। ব্রিয়েনের সাথে লড়াইয়ে প্রায় মরতে বসেছিল সে।

জনের সাথেও বেশ কয়েকটি কথোপকথন হলো টরমুন্ড, বেরিক আর জোরাহ’র। টরমুন্ড তাকে কিং বিয়ন্ড দ্যা ওয়াল ম্যান্স রেইডারের নতিস্বীকারের কথা উল্লেখ করে বলল ম্যান্সের গোয়ার্তুমির কারণে কতজনের প্রাণহানি হয়েছিল। প্রকারান্তরে জনকে ডেনেরিসের কাছে নতিস্বীকারের পরামর্শই দিচ্ছে সে।

“You spent too much time with the Free Folk. Now you don’t like kneeling. Mance Rayder was a great man. Proud man. The King Beyond the Wall and never bent the knee. How many of us people died for his pride?”

টরমুন্ডের কাছ থেকে এমন উপদেশ সত্যিই বিস্ময়কর। অন্তত ম্যান্স রেইডারের পরিস্থিতি আর জনের পরিস্থিতির কোন তুলনা হয় না। ম্যান্স তখন পরাজিত ও বিধ্বস্ত বাহিনীর এক বন্দী নেতা। আরেক রাজা স্ট্যানিস তাকে বশ্যতা মেনে নিতে বলেছে। তার সৈন্যরা অনেকে নিহত, অনেকে আহত এবং বন্দী, এদের মাঝে নারী ও শিশুও আছে। এরা সবাই ওয়াইল্ডলিং, ‘free folk’, সারাজীবন স্বাধীনতার জীবন যাপন করেছে। যুদ্ধে হেরে এখন তাদের ভিনদেশী রাজার অনুগত হয়ে পরাধীন জীবন যাপন করতে হবে। ওয়ালের দক্ষিণের মানুষেরাও তাদেরকে সহজে মেনে নিবে না। তাদের বাসস্থান নেই, জমিজমা নেই। এখানের কেউ তাদের আশ্রয়ও দিচ্ছে না। যে রাজা নতিস্বীকার করতে বলছে, সে নিজেও এখানে থাকবে না। যুদ্ধে সাম্রাজ্য জয়ের পরে দক্ষিণের রাজধানীতে চলে যাবে। অর্থাৎ ওয়েস্টেরোস দাসবিহীন হলেও তারা প্রকারান্তরে বন্দী বা দাসের মতই ব্যবহৃত হবে। এরকম পরিস্থিতিতে নতিস্বীকার করে কি আদৌ কোন লাভ আছে? ম্যান্সের মত রাজা, যে বিশ বছর ধরে ফ্রি ফোকদের একত্র করেছে। উত্তর থেকে নেমে আসা হোয়াইট ওয়াকারদের হাত থেকে রক্ষার জন্য যাদেরকে নিয়ে ওয়ালে আক্রমণ করেছে। সেই রাজা কেন এমন বন্দীজীবনে রাজি হবে? এর চেয়ে কি মৃত্যুই ভাল ছিল না? অপরদিকে জনের পরিস্থিতি মোটেই এমন না। তার রাজ্য নর্থেই, রাজ্যের অন্যান্য ব্যানারম্যানরা তার সাথে আছে নিজ নিজ সৈন্যবাহিনী নিয়ে। আরেক রাজ্য ভেইলের বিশাল বাহিনীও তার সমর্থনে আছে। এখন বহিরাগত ডেনেরিসের সামনে নতিস্বীকারে তার লাভ কী? ডেনেরিসও তো তাকে এমন কিছু করতে বাধ্য করতে পারছে না। অনুমতি না দিলেও সে নিজের ইচ্ছাতেই এখন ওয়াইট ধরতে চলে এসেছে, ডেনেরিস তাকে থামাতে পারেনি। টরমুন্ড এসবই জানে, তারপরেও তার এতদিনের রাজাকে ভুলভাবে উপস্থাপন করল কেন? টরমুন্ড যতই হাসিঠাট্টা করুক, ফ্রি ফোক হওয়া নিয়ে বরাবরই গর্ব করে। সে তাহলে কেন ম্যান্স রেইডারকে ছোট করে কথা বলল? গল্পের প্রয়োজনে একজন কেউ দরকার ছিল, যার জনের সাথে খাতির আছে এবং যার কথায় জন প্রভাবিত হতে পারে। এই দলে এক টরমুন্ড ছাড়া এমন কেউ নেই, তাই চরিত্রে বেখাপ্পা হলেও তাকে দিয়েই নতিস্বীকারের উপদেশবাণী জনকে শোনানো হলো।

জনের সাথে জোরাহ’র একটা আলাপের দরকার ছিল। জোরাহ’র বাবা জেওর মরমন্ট ছিল নাইটস ওয়াচের লর্ড কমান্ডার। জন যখন প্রথম ওয়ালে আসে, তখন জেওর মরমন্ট মোটামুটি তাকে অভিভাবকের মতো আগলে রেখেছিল। ক্যাসেল ব্ল্যাকে একবার একটা ওয়াইট ঢুকে পড়েছিল, মৃতদেহ মনে করে যাকে রেঞ্জাররা ভেতরে নিয়ে এসেছিল। সেই ওয়াইট ‘জেগে’ উঠে জেওরকে আক্রমণ করে বসে। তখনই জনই নিজের জীবন বিপন্ন করে জেওরকে রক্ষা করেছিল। এর পুরষ্কারস্বরূপ জেওর মরমন্ট তাকে লংক্ল’ তলোয়ারটি দিয়ে দেয়। এই তলোয়ারের বিশেষত্ব হলো এটি ভ্যালেরিয়ান স্টিল দিয়ে তৈরি। সাধারণ লংসোর্ডের চেয়ে আকারে লম্বা কিন্তু গ্রেটসোর্ডের চেয়ে আকারে ছোট এই ধরণের তলোয়ারকে ‘বাস্টার্ডসোর্ড’ বলা হয়ে থাকে। এরকম একটা তলোয়ার যে কোন হাউজের জন্য অমূল্য সম্পদ। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে একে আগলে রাখা হয়। জেওর মরমন্ট তার নিজের ছেলের অপরাধে এতটাই অপমানিত হয়েছিলেন যে সেই সম্পত্তি জনকে দিয়ে দিয়েছিলেন। এখন সুযোগবশত জন আবার তলোয়ারটি জোরাহকে ফিরিয়ে দিতে চাইল। জোরাহ যদিও সসম্মানেই সেই অনুরোধে অসম্মতি জানালো। তার গর্হিত অপরাধে সে লজ্জিত, অনুশোচনা আর গ্লানিতে ভুগেছে দীর্ঘদিন। একটা ব্যাপারই ভাল লাগলো না, জোরাহে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে জন তার বাবা নেডকে নিয়ে বললো, “I’m glad he didn’t catch you.”, যা জনের মুখে অবিশ্বাস্য সংলাপের মতো শোনালো। দাসপ্রথার মত জঘন্য অপরাধে নেড যখন জোরাহকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল, তখন সে পালিয়ে গিয়েছিল। নেডের আদর্শ ও বিচারজ্ঞান সম্পর্কে জন ওয়াকিবহাল আছে। অথচ মাত্র এই কয়দিনের পরিচয়ে জন জোরাহকে এতটাই চিনে ফেলেছে যে এখন তার কাছে নেডের সিদ্ধান্তও ভুল মনে হচ্ছে! তার তো বরং শুরু থেকেই জোরাহ’র ব্যাপারে সন্দিহান হওয়ার কথা, কারণ আইনের চোখে সে একজন দাগী অপরাধী।

– “So what are you fighting for?”

– “Life. Death is the enemy. The first enemy. And the last.”

 

Death is the enemy. The first enemy. And the last.

বেরিক ডনডারিয়নের সাথে জন স্নো’র কথোপকথনটা বরং এর চেয়ে ভাল ছিল। আপাতদৃষ্টিতে ওয়াল পেরিয়ে এতটা উত্তরে এমন তীব্র শীত উপেক্ষা করে আসার কোন প্রয়োজন বেরিকের ছিল না। তারপরেও সে এসেছে শুধুমাত্র তার দেবতার নির্দেশে। আগুনের সে দেবতার ইশারায় জেনেছে তার বেঁচে থাকার উদ্দেশ্যই লড়াই করা। এই লড়াইয়ের শেষে মৃত্যু সুনিশ্চিত। তারপরেও যতক্ষণ জীবন ততক্ষণ লড়াই! এই সাতজনও সেই অমোঘ নিয়তির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। আমরা সবাই সেই নিয়তির দিকে যাচ্ছি। জন জানে মৃত্যুর কী স্বাদ! বেরিকের মতো তারও মৃত্যু হয়েছে, আবার জীবন ফিরে পেয়েছে। বেরিকের মতো তারও প্রশ্ন, কেন তার মৃত্যু চিরস্থায়ী হলো না? কেন তাকে ফিরিয়ে আনা হলো জীবনে? বেরিকের মতোই তার কাছেও উত্তর নেই। উত্তরের দরকারও হয় তো নেই, যেমনটা বেরিক বললো, কারণ একজন যোদ্ধার জন্য নির্দেশটাই গুরুত্বপূর্ণ, নির্দেশের পেছনের কারণ নয়। সেটা নির্দেশ যে দিচ্ছে তার ব্যাপার।

পথ চলতে এসব আলাপের মধ্যে দিয়েই তারা গন্তব্যের কাছে পৌঁছে গেল। আগুনের ভেতর হাউন্ড যে তীরের মতো পাহাড়ের চূড়া দেখেছিল, সেই পাহাড়ের কাছাকাছি এসে গেল তারা। কাছেই ঝর্ণাধারার পাশ দিয়ে এক হোয়াইট ওয়াকার আর তার সাথে গোটা দশেক ওয়াইট যাচ্ছিল। জন ও বাকিরা এদেরকে অতর্কিত হামলা করে। হোয়াইট ওয়াকারকে জন লংক্ল’ দিয়ে ধ্বংস করে। সাথেসাথেই তাদের চারপাশের ওয়াইটগুলো গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে যেতে থাকে। শুধু একটা ওয়াইটই ধ্বংস হয় না। এখানে নতুন একটা ধারণা পাওয়া গেল, সম্ভবত যে কোন হোয়াইট ওয়াকারকে মারলে তার সাথে সাথে যতগুলো ওয়াইট সে নিজে ‘তৈরি’ করেছে বা যেসব মৃতদের সে জীবন ফিরিয়ে এনেছে তারা সবাই ধ্বংস হবে। ওয়াইটটাকে শক্ত করে বাঁধার সময় তার তীব্র চিৎকারে আশেপাশেই থাকা বিরাট মৃতবাহিনী তেড়ে এলো।

রেয়গাল, ভিসেরিওন , ডেনেরিস ও টিরিয়ন

এর পরের প্রায় মিনিট বিশেক টানটান উত্তেজনা আর উদ্বেগের সাথে দেখা গেল ওয়েস্টেরোস তথা গেম অফ থ্রোনসের বাস্তবতাকে কাঁচকলা দেখিয়ে জন এবং ডেনেরিসসহ প্রায় সকলে কত অলৌকিকভাবে বেঁচে যায়। ওয়াইট ধরার সময় গেন্ড্রিকে দৌড়ে ওয়ালে ফেরত গিয়ে ডেনেরিসের কাছে রেইভেন পাঠাতে বলল জন। হোয়াইট ওয়াকার এবং মৃতবাহিনী সত্যিই আছে এটা জানাতে হবে। জন ও বাকিরা যে পথ হেঁটে এক বা দুই দিনে পাড়ি দিয়েছিল, সেটা গেন্ড্রি মুহূর্তেই দৌড়ে ওয়ালে পৌঁছে গেল! সাথে সাথেই রেইভেন পাঠানো হলো। আর সেই রেইভেন মুহূর্তেই মহাদেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ড্রাগনস্টোনে পৌঁছে গেল। খবর পাওয়ার সাথে সাথে বিন্দুমাত্র দেরি না করে ডেনেরিস রওনা দিল, নতুন সাদা পোশাকে সুসজ্জিত হয়ে। এতকিছু ঘটেছে মাত্র এক রাতের ব্যবধানে! কারণ চারিদিকে ওয়াইট ও হোয়াইট ওয়াকার দিয়ে ঘিরে থাকা জন-বাহিনী একটা পাথরের ওপর আশ্রয় নিয়ে সেই রাত পার করেছে। ওয়াইটরা কাছে আসতে পারে নি কারণ পাথরের চারপাশে পানির ওপর বরফ বেশ পাতলা এবং এগুতে গেলেও তা ফেটে ভেঙে যাচ্ছে। হাউন্ডের বাড়াবাড়িতে আবিষ্কার হলো যে বরফ রাতের ভেতরেই বেশ শক্ত হয়ে গেছে, পাথরের আঘাতেও আর ভাঙছে না। তাই অবশেষে ওয়াইট বনাম জন-বাহিনীর লড়াই শুরু হলো। এর আগে অবশ্য একটি মৃত ভালুকের আক্রমণে থোরোস মারা গিয়েছে। বেরিক এবং জনের জন্য মরে গেলে আর বেঁচে ফেরার উপায় নেই। অসংখ্য ওয়াইটদের আক্রমণে আঘাতে এরা যখন পর্যুদস্ত তখনই ত্রাণকর্তা হিসেবে আবারও আবির্ভূত হলো ডেনেরিস, সঙ্গে তিনটা ড্রাগন। এতক্ষণ চুপচাপ দূরে দাঁড়িয়ে থাকা নাইট কিং যুদ্ধে যোগ দিল। ডেনেরিসের ড্রোগন আগুন দিয়ে চারপাশের ওয়াইট মেরে পুড়িয়ে ঠিক পাথরের ওপর থেকে জনদের ওঠাচ্ছে। এই সুযোগে নাইট কিং তার বর্শা দিয়ে চাইলেই ড্রোগনকে মারতে পারতো। তা না করে সে উড়তে থাকা ড্রাগন ভিসেরিয়নকে মেরে ফেলে। এই সুযোগে ডেনেরিস হাউন্ড, টরমুন্ড, বেরিক ও জোরাহকে নিয়ে উড়াল দেয়। পেছনে রয়ে যায় জন, যাকে কয়েকটা ওয়াইট মিলে টেনে বরফশীতল পানিতে নামিয়ে ফেলে। পানিতে ডুবতে থাকা জন তার সাথে আঁকড়ে থাকা ওয়াইটদের হঠিয়ে ঠিকই পানির ওপর উঠে আসে। এরপর পুনরায় তাকে ওয়াইটরা ঘিরে ধরলে কোথা থেকে আবারও ত্রাণকর্তা! এবার জীবন্মৃত বেনজেন স্টার্ক, যে গত সিজনের শেষেও ব্র্যান ও মিরাকে রক্ষা করে ওয়ালে পৌঁছে দিয়েছিল। সে কীভাবে ক্যাসল ব্ল্যাকের কাছাকাছি জায়গা থেকে প্রায় দেড়শ মাইল দূরে এই ইস্টওয়াচের কাছে এল সেটা জানার কোন উপায় নেই। সে তার ঘোড়ায় করে জনকে পাঠিয়ে দিল, আর নিজে ওয়াইটদের মোকাবিলা করতে ঘুরে দাঁড়ালো আগুন হাতে।

পুরো সিকোয়েন্স জমজমাট অ্যাকশনের বাহার, সিজিআই-এর উৎকর্ষে ভরপুর রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতাই দিবে। কিন্তু গল্পের হিসেবে এর চেয়ে গাঁজাখুরি চিন্তাহীন সিকোয়েন্স গেম অফ থ্রোনসের ইতিহাসে এর আগে কখনো দেখা যায়নি। দেখতে দেখতে একবারের জন্যেও মনে হয়নি জন বা ডেনেরিসের প্রাণের ঝুঁকি আছে। দর্শকপ্রিয় ড্রোগনও কোন এক অজানা কারণে অক্ষত আছে, মারা গেছে যে ড্রাগনটি সেটিকে দর্শকরা ভাল করে চেনেও না। আগে যেখানে গেম অফ থ্রোনসে যুদ্ধ বা মারামারিতে যৌক্তিকভাবেই চরিত্রগুলো বিপদে পড়তো, কিংবা নিজেদের ভুলে জীবন খোয়াতো, তেমন ভুল করেও এবার সকলেই নিরাপদে যার যার ডেরায় ফিরে গেল। এটাকে লেখকদের গাফিলতি, নাকি এইচবিও তথা প্রযোজক-নির্মাতাদের খামখেয়ালিপনা তা নিয়ে বিভ্রান্তিতে পড়তে হয়।

যুক্তিহীন যুদ্ধের উদাহরণের পরই ডেনেরিস ও জনের ভেতরে ভালোবাসাময় দৃশ্যটি যেন বলিউডের সস্তা কোন ছবি থেকে হুবহু উঠে চলে এসেছে মনে হলো। আঘাত থেকে অজ্ঞান জন ধীরে ধীরে চোখ খুলছে, ঝাপসা চোখের দৃষ্টি ধীরে পরিষ্কার হলো। দেখা গেল সামনেই ডেনেরিস ছলোছলো চোখে তাকিয়ে আছে। আর তাদের মাঝে সংলাপেরও কী ছিরি! জন সম্ভবত ‘মিল্ক অফ দ্যা পপি’র কারণে কিছুটা অপ্রকৃতস্থ হয়ে আছে। তাই সে একবার ডেনেরিসকে ‘ড্যানি’ ডাকছে, আবার বিনা বাক্যব্যয়ে নতিস্বীকার করছে। যে কারণে সে এতদিন ডেনেরিসের সামনে নতিস্বীকার করেনি, তার কোনটাই তো দূর হয় নি। বরং ডেনেরিসই দেখেছে জনের প্রতিটা কথা সত্যি, তাই জনকে নতিস্বীকার করতে না বলে তার এবং নর্থের সৈন্যশক্তিকে একত্র করার কথা বলবে। যে নর্থ ব্যানারম্যানদের অনমনীয়তার কারণ দেখিয়েছিল জন, সেই ব্যানারম্যানরা যদি এবার ক্ষেপে ওঠে, তাহলে কি তাদেরকে খুব বেশি দোষ দেয়া যায়? জন নিজেই তো তাদের মতামতকে এত গুরুত্ব দিতো, আজ হঠাৎ কী হলো, তারা গৌণ হয়ে গেল! কাঁচা আবেগে থরোথরো কিছু সংলাপ আউড়ে রীতিমত জোর করেই গল্পের গরুকে গাছে তুলে দেয়া হচ্ছে। ডেনেরিস ও জনের রাজনৈতিক দর্শনে ব্যাপক দূরত্ব আছে, শাসনপ্রক্রিয়ার ব্যাপারে মতবিরোধ আছে, নাইট কিংকে কী করে হারানো যায় সেটা নিয়েও মতামতে পার্থক্য থাকতে পারে। সেসব এতদিন ধরে সুস্পষ্ট হয়ে দেখা যাচ্ছিল। আজ স্রেফ একটি অ্যাকশন সিকোয়েন্সের কারণে সেসব পার্থক্য যেন তুষারকণার মতই উড়ে চলে গেল। গেম অফ থ্রোনসের গল্পের গাঁথুনি এতদিন যথেষ্টই শক্ত ছিল বলে এহেন সস্তা প্রেম বা ফাঁপা সংলাপ চোখে পড়তো না। কোন এক অজানা কারণে এখন সেই সূক্ষ্ণ মারপ্যাঁচ এবং চরিত্রের গভীরতা পুরোপুরি হারিয়ে গিয়েছে। আর সে জায়গায় দেখা যাচ্ছে জনপ্রিয়তার ধারা মেনে জলো ছেলেভুলানো গপ্পোগাঁথা।

Anik Andalib

Teacher by profession. Writer by passion. Loves to read and write about science, literature, films, and TV shows.

FOLLOW US ON

ICE Today, a premier English lifestyle magazine, is devoted to being the best in terms of information,communication, and entertainment (ICE).