উৎসবের ফেরিওয়ালা, রঙের কারবারি

ধর্ম যার যার উৎসব সবার। আবহমান বাংলার এই সম্প্রীতির মনোভাব প্রতিটি সর্বজনীন উৎসবকে করে তোলে রঙিন, উচ্ছ্বল। বিভেদের বিষবীণা ভুলে আমাদের মন নেচে ওঠে সামষ্টিক ঐকতানে। আর তখন ছোটবেলার পাঠ্য বই থেকে অক্ষরগুলো আপনা-আপনি ধ্বণিতে রূপান্তরিত হয়, ‘আজ ঈদ। আজ সারদীয় দুর্গোৎসব, আজ বৌদ্ধ পূর্নিমা, আজ পহেলা বৈশাখ… বাংলার পথে পথে আনন্দ; নতুন ঝলমলে পোশাক পরে ধরণীতে রংধনু নামিয়ে এনেছে শিশুরা..’। যেন একটা সমোচ্চারিত গান ষড়ঋতুর লাবণ্যময়ী বাংলাকে হিল্লোল সমীরণে ফিঙে পাখির মতো নাচিয়ে দিতে চায়। সেই আলোর নাচন, উৎসবের রং- সঞ্চারিত হতে চায় প্রকৃতিতে, মনে, মননে। মুসলিম সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব তখন আর কেবল ধর্মীয় থাকে না, হয়ে ওঠে সর্বপ্লাবি; যাতে অবগাহন করতে চায় ধনী-গরিব, ছোট-বড় সবাই। কিন্তু ভাবের নৌকা ভবের হাটে কত দূর যায়? যেতে পারে?

সেই কবে থেকে চেঁচাচ্ছেন নজরুল, ঝাকড়া চুল থেক উন্মাদবৃক্ষ অবধি, “বেলাল! বেলাল! হেলাল উঠেছে পশ্চিম আসমানে,লুকাইয়া আছ লজ্জায় কোন মরুর গোরস্থানে। রোজা এফতার করেছে কৃষক অশ্রু- সলিলে হায়, বেলাল! তোমার কন্ঠে বুঝি গো আজান থামিয়া যায়। জীবনে যাদের হররোজ রোজা ক্ষুধায় আসে না নিদ। মুমুর্ষ সেই কৃষকের ঘরে এসেছে কি আজ ঈদ?”

স্বীকার করতেই হয়, সেই হাড় জিরজিরে মানুষের সংখ্যা কমে এসেছে। দেশে এখন দুর্ভিক্ষ হয় না, মন্বন্তর হয়না। কিন্তু মানুষের অভাব তো আকাঙ্খার সমান। সেই আকাঙ্খার দুর্বলতা কিংবা শুধু চাওয়ার মহাসড়কে কালে কালে ঈদ উৎসবে বাড়ছে জৌলুস। আমাদের বাপ-দাদার আমলে যেখানে ঈদ উৎসব ছিল সকালে নামাজ পড়া দিয়ে শুরু আর বিকালে নৌকাবাইচ কিংবা গম্ভিরা গানে সন্ধ্যার আগমন, সেখানে এখন ৭ দিনের বর্ণাঢ্য ঈদ আয়োজন। সকালে হালকা বৈঠকি, দুপুরে নবাবী মেন্যু, বিকেলে গীতি মালতি, সন্ধ্যায় লাইভ কনসার্ট, রাতে ধামাকা প্যাকেজ আনন্দ, দেররাতে রূপালী দুনিয়ার ঝলমলে ভিজ্যুয়াল প্লেজার।

ঈদ এলেই বাজার বর্ণিল হয়ে ওঠে। আহা বাজার! উৎসবের ফেরিওয়ালা, রঙের কারবারি, বাণিজ্য লক্ষ্মী বাজার। এখন একটা দিনমুজুরও ঈদে নতুন পোশাক কেনে। তার ছেলেমেয়ে আছে, যারা সেটেলাইট চ্যানেল দেখে, দেখে নায়ক-নায়িকার ফ্যাশন। বোকাবাক্সে বারবার বলা হয়, এবার কারিনা ড্রেস খুব ভালো চলছে, এইবার ছাম্মাক ছাল্লো। তাই দেখে বাজার সরগরম। গোসাইপুরের গেদি বেগম ঈদ শপিং-এ যায়। কতো রং বেরঙের আলো; তাই দেখে ঝলসে যায় চোখ, স্বপ্নে ঢুলুঢুলু হয়। এই স্বপ্নের চোরাস্রোতের টানেই কিনা কে জানে একটা মানুষের জীবনের চেয়ে একটা পাখি ড্রেসের দাম অনেক বেশি হয়ে যায়। ২০১৪’র ২৬ জুলাই চাপাইনবাবগঞ্জের কানসাটে জিল্লু কসাইয়ের মেয়ে ছালেকা পাখি ড্রেস না পেয়ে ইঁদুর মারার ওষুধ খেয়ে আত্মঘাতি হয়। আমাদের মনে পড়ে যায়, ১১ শ্রাবণ ১৪২১ বঙ্গাব্দে, চক রতনপুর মৌজা, মিস্ত্রী বাড়ির কথা। একটা সিতা হারের জন্য দশভূজা দুর্গাকে নালিশ করে আত্মহত্যা করেন সেজ বৌ কাবেরি দেবী।

আহারে মেয়ে কে বোঝায় তোকে, এটা উৎসবের রং না, তুই যে আলো দেখিশ তা আলেয়া; ক্ষণিকের ফানুস!

তবু বাঁচতে হয়। মেরুল বাড্ডার ঘিঞ্জি বস্তিতে আকলিমা-জেবা-রহিমাসহ অমলিন নামের মেয়েরা যারা চোখের জ্যোতি ঘঁষে বুনে চলে নভোচারীর পোশাক, যাতে কখনো কখনো লেখা হয় মানুষের জয় হোক, মানবতা জীবিত থাক; সেই সেলাই দিদিমনিরা কখনোই কিনতে পারে না নিজের বানানো পোশাক, যেমনি জামদানি পল্লীর নাম না জানা মহিলাটি কখনোই জানে না শাড়ির বুনন আত্মায় কীভাবে সুক্ষ আভিজাত্য আনে অথবা আনে না। ঈদ এলেই কখনো কখনো মালিক বলে, এইবার ব্যবসা মন্দা, বেতন বোনাস দিতে পারুম না। তখন আকাশে পূর্নিমার চাঁদও থাকে না; ঝলসানো রুটিও মনে হয় খোয়াবি পোলাও। তবু চাঁদ ওঠে। এক ফালি। ধিরে ধিরে জোয়ারভাটার লাগাম ধরে ভরাট হয়। একসময় বৃষ্টির বাদলার মেঘ ফুড়ে দেখা দেয় আষাঢ়ে পূর্ণিমা। পূর্নিমার ঝকঝকে রূপোর থালা লক্ষ্য করে উড়ে যেতে চায় ফানুস। কঠিন চিবর দানে বৌদ্ধরা শিখে নিতে চায় সংযমের মাহাত্ম। তখন দূর থেকে হয়তো রামুর ৪শ বছর পুরনো বৌদ্ধমন্দিরে শুয়ে থাকা গৌতমের মাথার ওপরের বোধিবৃক্ষে আগুন লাগে। সেদিন বসন্ত কিংবা সখি-উৎসবে মেতে ওঠে যারা আমরাও হয়তো থাকি সেই আগুনে হাত তাপানো মধুলোভীদের দলে। কোনো এক নিপিন বড়ুয়া কাঁদতে কাঁদতে বলে ৭১-এ খান সেনারাও এমন ঘৃণার আগ্নিগোলা ছুড়ে মারেনি ভুল করে। অথচ স্বাধীন দেশে স্বজাতিদের হাতে আজ এভাবে কাবাব হতে হচ্ছে আমাদের! এটা কি স্বাধীন দেশ? এই জন্য কি বুকের রক্ত দিয়েছিলাম। আমরা ভাবুক হয়ে উঠি। দেশপ্রেমিক হবার চেষ্টা করি। তাই বিজয় আর স্বাধীনতা দিবসে দেশ বুটিক হাউজে সবুজ জমিনে লাল সূর্য ধরা দেয়। শোকের মাস ফেব্রেুয়ারিতে কালো-সাদা জমিনে প্রাণের অক্ষর; বর্ণমালা বাবার চেষ্টা করে ‘সম্প্রীতি’ শব্দটি লিখতে। লিখতে চাই ‘আমরা’। আমাদের স্মৃতির মিনার ইতিহাস থেকে বেরিয়ে এসে ধরে ফেলতে চায় গগন চৌহদ্দি।  ওদিকে, গগন হরকরা গান জুড়ে দেয়, ‘আমি কোথায় পাবো তারে?’ আবার সীমানার ওপারে রোহিঙ্গাদের ওপর নেমে আসে আগুনের গোলা। কোলের পোলাপান নিয়ে নাফ নদীতে ভাসতে ভাসতে বৃষ্টির পানি চোখের পানি একাকার হয় খাদিজার। এক দেশ ওকে নেবে না, অন্য দেশ দেবে না এতটুকু আশ্রয়। উপরে ঘন অন্ধকার নীচে মাটি নাই, দরিয়া শুধু। আমি বলি, কোথায় পাব বিশুদ্ধ বাতাস, যাতে অন্তরাত্মা শুদ্ধ হয়?

আজ উৎসব মানেই বিকিকিনি, টাকার চক্কর, বাছবিচারহীন মুনাফার ফন্দি। তাইতো রোযার মাসে মজুদখোরের পোয়াবারো। ঈদে নাভিশ্বাস! সব ছেড়েছুড়ে যে পড়িমরি মায়ের হাসির কাছে ফিরে যাব সেখানে নাড়ির টানে প্রতিবদ্ধকতা। এমনকি, রিক্সাওয়ালাকে বিশ টাকার ভাড়া পয়ত্রিশ না দিলে মুখ গোমড়া, ‘আফা, ঈদ বুনাস দিলেন না!’

কোরবানির ঈদ, মনের পশুকে খতম করার ব্রত। অথচ ঈদে কার গরু কত বড়, কে কয়টা খাসি দিলো তাই নিয়ে হামবড়া। যে গরু কোরবানি দিই, সেই গরু যেভাবে চোরাইপথে ভারত থেকে আসে, ঘাটেঘাটে পয়সা গুনতে হয়, পশুর হাট নিয়ে গোলাগুলি, চাঁদাবাজি, কোথায় ত্যাগের মহিমা? পশুর চামড়া বিক্রির টাকা পাবে মিসকিন। কিন্তু প্রতি বছর ট্যানারি মালিক সমিতি ঈদ আসলেই দীনদুখী হয়ে পড়ে। নানা অজুহাতে চামড়ার দাম কম নির্ধারণ করতে চায়। কোরবানির দিন মহল্লায় চামড়া সংগ্রহ করবে কে তাই নিয়েও খুনোখুনির নজির কম নয়। তারপরেও ঈদ বলে কথা।

পৃথিবীর সব দেশে উৎস-পার্বণে জিনিশপত্রের দাম কমে, কিন্তু বঙ্গদেশে উল্টো। আরে ভাই, কি করে বলি, আমি ছোট চাকুরিজীবী, কি করে পারি এই অবিচারের ডাইনোসারের সাথে? আজ তোমাকে বেশি দিচ্ছি। কাল আবার তোমার গলায় ছুরি বসিয়ে আদায় করে নেব। এভাবে একটা দুষ্টু চক্রে সবাই বন্দী। আবার ভাবি, যে লোকটি শহরে রিক্সা চালায়, রোদে পুড়ে বৃষ্টিতে ভিজে সচল রাখে নগরীর গতি, তারও তো সংসার আছে। হয়তো দূর দেশে তার বিবি।

আজ এই উৎসব মৌসুমে, খুশির পাপিয়া পিউ পিউ গাহে দিগ্বিদিক। বধূ জাগে আজ নিশীথ-বাসরে নির্নিমিখ! কোথা ফুলদানী,কাঁদিছে ফুল, সুদূর প্রবাসে ঘুম নাহি আসে কার সখার, মনে পড়ে শুধু সোঁদা-সোঁদা বাস এলো খোঁপার, আকুল কবরী উলুঝুলু! সেই নারীকে তো কিছু দিতে হয় ঈদ পারিতোষিক! চাঁদকে নিশানা ধরে তাই ছুটে চলে পুরুষ। ছেলে যায় মায়ের কাছে, মা পেতে চায় সন্তান সান্নিধ্য। প্রেম যায় মায়ার বাড়ি। বড়ই বিচিত্র। একদিকে বাজার অর্থনীতি, ভোগের সংস্কৃতি, অন্যদিকে মানুষের মানবিকতা- কেমন শক্ত সাবলীল সহাবস্থান। পৃথিবীর সবচেয়ে দুর্নীতিবাজ মানুষটিও চায় প্রিয়জনের সাথে উৎসব আনন্দ ভাগ করে নিতে। তাই তো প্রতি বছর ট্রেনের ছাদ, দুই বগির সংযোগস্থলে পুটলি হয়ে কিংবা মফিজ বাসে বাক্সপেটরার সাথে জড় ক্লিব পাথর খণ্ড হয়ে, পাথরের ভেতরে এক টুকরা চোরা-টান বাঁচিয়ে রেখে, সড়ক দুর্ঘটনা আর নৌকাডুবির মৃত্যু মিছিল পেরিয়ে মানুষ ছুটে যেতে চায় প্রিয় আঙিনায়। রক্তের টান, আত্মার আত্মীয়, তোমাকে ছাড়া উৎসব কিসের?

তবু এ কথা সত্যি, এই দেশে এখনও ঈদ-পার্বণে উল্টা করে জামা পরে এমন অনেক পথশিশু আছে। যারা শহরের কোনো সিগন্যাল ক্রসিং-এ বেলিফুলের মালা বেঁচে, পড়তে না পারলেও বিক্রি করে এ ফর অ্যালিফ্যান্ট, বি ফোর বুক, তাদের কাছে ঈদ মানেই হয়তো পেটপুরে খাওয়া। শাকিব খানের কড়া ডায়লোগে সিটি মেরে ওঠা.. তারপর আবারও সিগন্যাল ক্রসিং। সেইসব পথশিশুদের মুখে হাসি ফোটানোর কথা বলে কখনো কখনো কোনো উৎসব আয়োজনে বড় কোম্পানি জামার নামে নিজেদের পণ্যের বিজ্ঞাপন সেটে দেয়। তখন ওইসব শিশুকে মনে হয় ভ্রাম্যমান বিজ্ঞাপনী সংস্থা আর আর ঈদটাকে একটা কেনাকাটার সামগ্রী।

mm
Majul Hassan

Majul Hassan is a Poet and Fiction writer of Bangladesh. He is the author of several poetry and short story collections. Currently, he works as Senior Joint News Editor at a private news television.

FOLLOW US ON

ICE Today, a premier English lifestyle magazine, is devoted to being the best in terms of information,communication, and entertainment (ICE).